ঢাকা   শুক্রবার, ৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯   রাত ৩:১৬ 

সর্বশেষ সংবাদ

বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদের ফাঁসি কার্যকর, নারায়ণগঞ্জে দাফন

বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আব্দুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। শনিবার দিবাগত রাত ১২ টা ১ মিনিটে ঢাকার কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ফাঁসি কার্যকরের সময় ঢাকার জেলা প্রশাসক,এসপি, সিভিল সার্জন,নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, আইজি (প্রিজন্স), কারা চিকিৎসকসহ কারাকর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ফাঁসি কার্যকরের পর তার মরদেহ ময়নাতদন্ত হয়। সেখান থেকে মরদেহ কফিনে ভরে পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এটাই প্রথম ফাঁসি। আর বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের মধ্যে মোট ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর হল।
মাজেদের লাশ নিয়ে বের হওয়ার সময় কারাফটকের সামনে জড়ো হওয়া আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের কর্মিরা জুতা ও থুথু নিক্ষেপ করেন।
এদিকে খুনি মাজেকে তার জন্মস্থান ভোলায় দাফন করতে দেয়া হবে না বলে আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন ভোলার এমপি শাওনের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশংকায় প্রশাসন রিস্ক না নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে মাজেদের শ্বশুরবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুসারে শম্ভুপুরা ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে তার শ্বশুরবাড়িতে অত্যন্ত গোপনে রাত তিনটার দিকে দাফন করা হয়।
এদিকে বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদের লাশ সোনারগাঁওয়ে দাফন করার খবর সকালে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

এর আগে বৃহস্পতিবার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আব্দুল মাজেদের প্রাণভিক্ষার আবেদন খারিজ করে দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। বৃহস্পতিবার সকালে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা নাকোচের চিঠি কারাগারে পৌঁছে।

জানা যায়, আদালত থেকে আসা মৃত্যু পরোয়ানা কারা কর্তৃপক্ষ মাজেদের কাছে দেয়। সেটি পাওয়ার পর রাতেই মানবিক বিবেচনায় রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চান খুনি আব্দুল মাজেদ। এর প্রেক্ষিতে রাতেই সেই আবেদন রাষ্টপতির কাছে প্রেরণ করা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে রাষ্ট্রপতি তার সেই প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করে দেন। প্রাণভিক্ষার আবেদন খারিজ হওয়ার পর শুধু ফাঁসির অপেক্ষায় ছিল আব্দুল মাজেদ।

কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, শুক্রবার আবদুল মাজেদের পরিবারের সদস্যরা কারাগারে এসে তার সঙ্গে শেষ দেখা করে যান।

এর আগে, ৬ এপ্রিল সোমবার দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামিকে গ্রেফতারের পর মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে পেশ করার পর তার মামলার সমস্ত নথি দেখে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। গ্রেফতারের পর মাজেদ জানান, তিনি ২৪-২৫ বছর ধরে ভারতের কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকে তিনি নিজেই বাংলাদেশে এসেছেন। তবে কবে এসেছেন সে সম্পর্কে কিছু বলেননি তিনি।

মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ১২ টার দিকে ফৌজদারি কার্যবিধি ৫৪ ধারায় তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। এসময় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় গ্রেফতার না দেখানো পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করে কাউন্টার টেরোরিজম। আদালত শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
বুধবার বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদের মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ হেলাল চৌধুরী। সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি নিয়ে ওই কোর্টের ছুটির আদেশ বাতিল করা হয়। এরপর বিচারক মাজেদের মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন। লাল কাপড়ে মোড়ানো এই মৃত্যু পরোয়ানা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এছাড়া পরোয়ানার একটি কপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকার জেলা প্রশাসকের দপ্তরে পাঠানো হয়। মৃত্যু পরোয়ানা কারাগারে পাঠানোর পর তা খুনি মাজেদকে পড়ে শোনায় কারা কর্তৃপক্ষ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পলাতক ছয় আত্ম-স্বীকৃত খুনির মধ্যে তিনি অন্যতম। পলাতক বাকি পাঁচ খুনিরা হলো আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এম রাশেদ চৌধুরী, এসএইচএমবি নূর চৌধুরীও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ৩৪ বছর পর এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর। খুব ধীরে দীর্ঘ বারো বছরে নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে আইনের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছতার সঙ্গে অতিক্রম করে সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে স্বঘোষিত খুনিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে কারাবন্দি পাঁচ আসামির ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি দিবাগত রাতে ফাঁসি কার্যকর হয়। তারা হলেন সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মুহিউদ্দিন আহমেদ, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য পাঁচ আসামি এখনো পলাতক। তারা হলেন—খন্দকার আবদুর রশিদ, শরীফুল হক ডালিম, এ এম রাশেদ চৌধুরী, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী ও মোসলেম উদ্দিন। এদের মধ্যে লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আব্দুর রশিদ (বরখাস্ত) লিবিয়া ও বেলজিয়ামে অবস্থান করছেন। বেশিরভাগ সময় লিবিয়াতে থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। লে. কর্নেল (অব.) শরীফুল হক ডালিম (বরখাস্ত) পাকিস্তানে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। পাকিস্তান থেকে হংকংয়ে তার যাতায়াত রয়েছে বলে একাধিক সূত্রে প্রকাশ। লে. কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী (বরখাস্ত) যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে, লে. কর্নেল (অব.) এন এইচ এমবি নূর চৌধুরী (বরখাস্ত) কানাডায় রয়েছেন। আরো একজন ভারতে কারাগারে আটক বলে অনেকে ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে যার নাম রিসালদার মোসলেম উদ্দিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

eighteen + 3 =

সবচেয়ে আলোচিত