ঢাকা   মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯   রাত ১২:০৬ 

সর্বশেষ সংবাদ

দুদকের সাবেক এক ডিজির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ; অনৈতিক পন্থায় দায়মুক্তি দিয়ে গেছেন অনেক দুর্নীতিবাজের

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে বিদায় নেয়া সাবেক এক মহাপরিচালক(ডিজি)র বিরুদ্ধে অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে বেশ কয়েকজন দুর্নীতিবাজকে দায়মুক্তি দেয়ার অভিযোগ ওঠেছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ খোদ দুদকই অনুসন্ধানে নামতে চায়। কিন্তু প্রশাসন ক্যাডারের উর্ধতন এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদৌ অনুসন্ধান করা সম্ভব হবে কী না এ নিয়ে সন্দিহান দুদক কর্মকর্তারা। কারণ দুদকের সাবেক এই কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত সচিব হয়ে দুদক থেকে সরে গেছেন। দুদকের সংশ্লিষ্টরা জানান, দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ )হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন প্রশাসন ক্যাডার থেকে আসা যুগ্ম সচিব সাঈদ মাহবুব খান । এই পদটি দুদকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের, যাচাই বাছাই থেকে শুরু করে অভিযান পরিচালনার যতো দায়িত্ব রয়েছে এই টিমের।
অভিযোগ রয়েছে মহাপরিচালক সাঈদ মাহবুব খান ‘পিক এন্ড চুজ” এর ভিত্তিতে যাচাই বাছাই এবং অভিযান পরিচালনা করার নির্দেশনা দিতেন। কোনো অভিযোগ সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধানের পর, এমন কিছু প্রভাবশালীকে তিনি দায়মুক্তি দেয়ার সুপারিশ করেছেন যার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। এমন বেশকিছু তথ্য এসেছে গণমাধ্যমের হাতে।
দুদক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)র তৎকালীন কমিশনার মো. রেজাউল কাদেরকে দায়মুক্তি দেয়া হয়। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ছিল। দুদকের উপ-পরিচালক মো. সিরাজুল হক অভিযোগটি অনুসন্ধান করেন। এই অনুসন্ধানটি হয় দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান-তদন্তের দায়িত্বে থাকা মহাপরিচালক সাঈদ মাহবুব খানের নির্দেশে। কিন্তু অনুসন্ধান শেষে তাকে দায়মুক্তির সুপারিশ করা হয়। অথচ রেজাউল কাদেরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানকারি কর্মকর্তা এর সত্যতাও পেয়েছেন। কিন্তু সাঈদ মাহবুবের স্বাক্ষর চলতি বছর ১১ মে দায়মুক্তি (স্মারক নং-০০.০১.০০০০.৫০০/৭৮/০০১.২২.৪০) দেয়া হয় মো. রেজাউল কাদেরকে। অভিযোগ,দুদকের বিদ্যমান গাইডলাইন বা ম্যানুয়াল অনুসরণ না করেই নথি পরিসমাপ্ত করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার (লজিস্টিক ও প্রকিউরমেন্ট) ইমাম হোসেনের বিরুদ্ধে ছিল কেনাকাটায় অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেয়ার অভিযোগ। পুলিশের রেশন সামগ্রি কেনা-কাটা, অন্যান্য সামগ্রী ও গাড়ির যন্ত্রাংশ ক্রয়ের নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন ইমাম হোসেন। তার বিরুদ্ধে মামলা রুজুর অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দুদকের তৎকালীন মহাপরিচালক সাঈদ মাহবুব খান তাকে দায়মুক্তি (স্মারক নং-০০.০১.০০০০.৫০০.৫০.০৪১.২২.৪১) দেন। গুরুতর এই দুর্নীতির অভিযোগ থেকে প্রভাবশালী এই পুলিশ কর্মকর্তাকে তিনি দায়মুক্তি দেন চলতি বছর ১২ মে। এ সময় তিনি সচিবের ‘রুটিন দায়িত্ব’ পালন করছিলেন।এই অভিযোগটি অনুসন্ধান করেন উপ-পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিউট (বিএসটিআই)র তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) মো. খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে রয়েছে নিয়োগ বাণিজ্য, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগ। দুদক থেকে বদলি হয়ে যাওয়া তৎকালীন মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরীর নির্দেশনায় বিএসটিআই’এ ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম। অভিযানকালে দুদক টিম নিয়োগ বাণিজ্যের প্রমাণ পায়। বিএসটিআইর অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পরীক্ষার টেবুলেশন শিট জালিয়াতির মাধ্যমে নম্বর পরিবর্তন করে ৬ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। টেবুলেশন শিটে নিয়োগ কমিটির সদস্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী থাকা সত্বেও তাকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। ৭৭টি শূন্যপদের বিপরীতে ৬৮জনকেই নিয়োগ দেয়া হয় অর্থের বিনিময়ে। দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ফরিদপুর অফিসের অফিস সহায়ক মো. রূহুল আমিন পরিচালক (প্রশাসন) খলিলুর রহমানের শ্যালিকার ছেলে। ফরিদপুর ডাটা এন্ট্রি ও কন্ট্রোল অপারেটর সফিকুল ইসলাম খলিলুর রহমানের ভাতিজা। ঢাকায় কর্মরত খালাসি মো. সালাউদ্দিন খলিলুর রহমানের চাচাতো শ্যালক। ফরিদুপরের ডাটা এন্ট্রি ও কন্ট্রোল অপারেটর মহিউদ্দিন পরিচালকের ভাতিজি জামাই। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই অনুসন্ধানটিতে পর্যাপ্ত প্রমাণাদি থাকা সত্ত্বেও ইকবাল মাহমুদ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়মুক্তি দেয়া চেষ্টা করেন। তবে তার চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় নির্দশেনা দিয়ে যান সাঈদ মাহবুব খানকে। ফলে তিনি দায়মুক্তি দেন এ অভিযোগের। দুদকের সহকারী পরিচালক শেখ গোলাম মাওলা ও উপ-সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে একটি টিম অভিযোগটি অনুসন্ধান করছিল। পরে উপ-পরিচালক মামুনুর রশিদ চৌধুরী সাঈদ মাহবুবের নির্দেশনায় পরিসমাপ্তির সুপারিশ প্রদানে বাধ্য হন। গত ২৫ এপ্রিল দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেনের স্বাক্ষরে মো. খলিলুর রহমানকে দায়মুক্তি (স্মারক নং-০০.০১.০০০০.৫০০.৫০.০৩৭.২২.৩৭) দেয়া হয়।
জিওবি’র অর্থে উন্মুক্ত জলাশয়ে আহরণযোগ্য মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠির আর্থ সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাৎ এবং নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ছিল মৎস্য অধিদফতরের প্রকল্প পরিচালক মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। দুদদকের যশোর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন অভিযোগটি অনুসন্ধান করেন। তাকে দায়মুক্তি (স্মারক নং-০০.০১.০০০০.৬৭১.৩১.০২৫.২২.৩৭) দেয়া হয় গত ৮ মার্চ।
পল্লী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশন (পিডিবিএফ)র তৎকালীন ব্যবস্থপনা পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমানকে দায়মুক্তি (স্মারক নং-০০.০১.০০০০.৫০০.৫০.০৩৪.২২.৩৪) দেয়া হয় গত ১৯ এপ্রিল। তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, নামে বেনামে অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। উপ-পরিচালক (পদোন্নতিপ্রাপ্ত পরিচালক) মো. মোশাররফ হোসেইন মৃধা অভিযোগটি অনুসন্ধান করেন।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)র প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ। এছাড়া সিডিএ’র ঢাকা ট্রাঙ্ক রোডের সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে পছন্দসই ঠিকাদার নিয়োগ প্রদান করেন তিনি। অভিযোগ ছিল, লালখান বাজার থেকে শাহ আমনত বিমান বন্দর পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পে শর্ত পরিবর্তন করে ৬টি ঠিকাদারের মধ্যে ২ হাজার ৮৫৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশ ২০ কোটি টাকার লেনদেন করে ভাগভাটোয়ারা করে দেয়ার অভিযোগ ছিল। সিডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করেন উপ-পরিচালক শাহীন আরা মমতাজ। এটিতেও মামলার পরিবর্তে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে ‘পরিসমাপ্তি’র সুপারিশ করা হয়। আর এই পরিসমাপ্তির জন্য লেনদেন হয় বিপুল পরিমান অর্থের।
গত ১৮ মে দুদক সচিবের ‘রুটিন দায়িত্বে’ থেকে সাঈদ মাহবুব খান প্রভাবশালী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমানকে দায়মুক্তি (স্মারক নং-০০.০১.০০০০.৫০০.৫০.০৪৪.২২.৪৪) দেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা (সিনিয়র সহকারি সচিব) আসিফ ইমতিয়াজকে দায়মুক্তি (স্মারক নং-০০.০১.০০০০.৬৭১.৩১.৩০২.২১.৩১৮) দেয়া হয় গত ১৩ মার্চ। প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরকারি অর্থ লেনদেন, সরকারি অর্থ নিজের একাউন্টে রাখা এবং ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ প্রকৃত ভূমি মালিককে না দিয়ে ভুয়া দাবিদারদের প্রদান এবং বিপুল অবৈধ অর্থ অর্জনের অভিযোগ ছিলো। দুর্নীতির পর্যাপ্ত প্রমাণাদি সত্ত্বেও দায়মুক্তি দেয়া হয় আসিফ ইমতিয়াজকে।
বাংলাদেশ জুট করর্পোরেশনের (বিজেসি)র তৎকালীন চেয়ারম্যান, অতিরিক্ত সচিব মো. শামীম ইকবালসহ তিন জনকে দায়মুক্তি (স্মারক নং-০০.০১.০০০০.৫০০.৫০.০৩৫.২২.৩৫) দেয়া হয় গত ২০ এপ্রিল। তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয় বহির্ভুত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ছিলো। দায়মুক্তি পাওয়া বিজেসি’র অপর দুই কর্মকর্তা হলেন, পারচেজ অফিসার খায়রুল আলম ও পারচেজ অফিসার মো. হাবিবুর রহমান। হাবিবুর রহমান মারা যাওয়ায় তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। অভিযোগটি অনুসন্ধান করেন দুদকের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম। এমন আরও অভিযোগ ওঠেছে সাঈদ মাহবুব খানের বিরুদ্ধে। যিনি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে দুদক ছেড়ে চলে গেছেন।
জানা যায়, ইকবাল মাহমুদ দুদকের চেয়ারম্যান থাকাকালে তিনি তার পছন্দের প্রশাসন ক্যাডারের কয়েকজনকে দুদকে নিয়ে আসেন। তাদের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয় একটি বলয়। এই বলয়ের একজন সাঈদ মাহবুব খান। কথিত আছে, সাঈদ মাহবুব খান, দায়িত্ব পালনকালে মামলা দায়ের আর চার্জশিটের সুপারিশের চেয়ে দায়মুক্তির সুপারিশ করেছেন বেশী। অনেক নিরীহ ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, ভূমি অফিসের কানুনগো, ক্লার্ক, ড্রাইভার,এমএলএসের দুর্নীতি অনুসন্ধান-তদন্ত করতে আগ্রহ দেখাতেন বেশী। নিচুস্তরের কর্মচারীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ মামলা করে বাহবা নিতেন। দুদকের হটলাইনে আসা অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন দফতরে ‘অভিযান‘ পরিচালনার মাধ্যমে মিডিয়ায় খবর হতেন। কিন্তু দুর্নীতিবাজ রাঘব বোয়ালদের দায়মুক্তি দিতেন নিঃশব্দে। অনেককে ডেকেও আনাতেন। দুদকের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা মনে করেন, বাইরে থেকে ডেপুটেশনে বিশেষ ক্যাডারের কর্মকর্তারা দুদকে কিছুদিনের জন্য এসে এটাকে বাণিজ্যিক কার্যালয় বানিয়ে ফেলেন। তারা বড় পদে পদায়ন হন এবং তাদের অনৈতিক নির্দেশ অধস্তনদের মানতে বাধ্য করা হয়। নির্দেশনা না মানলে কি পরিণতি হয় তার নজির তুলে ধরে চাকরিচ্যুত উপ- সহকারী পরিচালক শরিফ উদ্দিনের বিষয়টি মনে করিয়ে দেন। ডেপুটেশনে আসা কর্মকর্তারা তাদের মিশন শেষে আবার ফিরে যান ফুলফেঁপে। আর দুদকে রেখে যান কালিমা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

11 + 12 =

সবচেয়ে আলোচিত