ঢাকা   শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯   রাত ৪:৫৪ 

সর্বশেষ সংবাদ

রাজধানীর ফুটপাত টাকার খনি; ঈদকে সামনে রেখে আদায় হবে সাড়ে ৪শ’কোটি টাকা চাঁদা,ভাগ যায় নানা স্তরে

ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীর ফুটপাত থেকে সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা চাঁদা টার্গেট করা হয়েছে। রাজধানীতে প্রতিদিন হকারদের কাছ থেকে চাঁদা নেয়া হয় ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। যা বছরে ৩ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। আইনশৃংখলা বাহিনী,ক্ষমতাসিন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা ও হকার নেতা, সিটি করপোরেশন ,বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত। বছরের পর বছর ধরে এই চাঁদাবাজি চলে আসছে। শুধু ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে আদায়কৃত চাঁদা দিয়ে অনেকেই কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে এমন তথ্য ওঠে এসেছে।
যদিও এ তথ্য নতুন নয়। এ নিয়ে গণমাধ্যমে লেখালেখি, বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে গবেষণা হলেও বন্ধ হচ্ছে না চাঁদাবাজি। বলা যায় রাজধানীর ফুটপাত হলো টাকার খনি। ফুটপাথের দখল নিয়ে একের পর এক হামলা, মারামারি ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটলেও ফুটপাথ থেকে দোকানপাট তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে সিটি করপোরেশন ও পুলিশ। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী এবং ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষের পর ফের আলোচনায় আসছে ফুটপাথে চাঁদাবাজি। শুরুতে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও পরে বাড়াবাড়ির জন্য শিক্ষার্থীরা ফুটপাথের চাঁদাবাজিকে দায়ী করেছেন। হকার নেতারা বলেছেন, ‘যেখানে ফুটপাথ আছে সেখানেই হকার আছে আর সেখানেই চাঁদা আছে। এই চাঁদাবাজিতে লাইনম্যান ও ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত থানা পুলিশ।’
রাজধানীর রাজপথ থেকে শুরু করে অলিগলি এমন কোনো ফুটপাত নেই যেখানে হকার বসেনা। আর এই হকার বসতে গেলেই দিতে হয় নির্ধারিত হারে চাঁদা।
অভিযোগ উঠেছে, এই ফুটপাথগুলো থেকে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় হওয়ায় ফুটপাথ থেকে দোকানপাট সরিয়ে দিতে পারছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফুটপাথের এক দোকানদার অভিযোগ করেন, এই চাঁদাবাজির ভাগবাটোয়ারায় রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে পুলিশেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে।
তারা সরাসরি চাঁদা না নিলেও কৌশল অবলম্বন করে ফুটপাথ থেকে হাতিয়ে নেয়া হাজার কোটি টাকা যাচ্ছে তাদের কাছে। আর এই অর্থ খোদ ব্যবসায়ী সমিতির মাধ্যমে ওইসব প্রভাবশালী নেতা ও পুলিশের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠে।
রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, নিউমার্কেট, গুলিস্তান, মতিঝিল এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা কেউ ভ্যানে, আবার কেউ ফুটপাথের ওপর দোকান বসিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
সূত্র মতে ঈদ মৌসুমে শুধু নিউমার্কেটকেন্দ্রিক চাঁদা তোলা হয় দৈনিক ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা। গুলিস্তানকেন্দ্রিক তোলা হয় ১৮ লাখ টাকা। মতিঝিল জোনে তোলা হয় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া উত্তরা থেকে ১০ লাখ ও মিরপুর এলাকায় ৯ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলমেন্ট ২০১৬ সালে ‘দ্য স্টেট অব সিটিজ ২০১৬ : ট্রাফিক কনজেশন ইন ঢাকা সিটি-গভর্নেন্স পারসপেক্টিভ’ শিরোনামে এক গবেষণায় উঠে আসে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ফুটপাথের হকারদের কাছ থেকে বছরে ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়, যা ওই সময়ে দুই সিটি করপোরেশনের মোট বাজেটের চেয়ে বেশি ছিল। আর প্রতিদিন চাঁদা আদায় হয় ৬০ কোটি টাকারও বেশি।
ওই গবেষণায় ঢাকায় তখন মোট হকারের সংখ্যা বলা হয় ৩ লাখ। আর প্রতি হকারের কাছ থেকে গড়ে তখন প্রতিদিন ১৯২ টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। ওই গবেষক দলের প্রধান ছিলেন ড. মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ। তিনি এখন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্নেন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তিনি জানান, ‘হকারদের সংখ্যা আমরা সংবাদমাধ্যম থেকে নিয়ে পরে যাচাই করে নিশ্চিত হয়েছি। আর চাঁদার পরিমাণ জেনেছি সরেজমিন কাজ করে। হকারদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেছি আমরা।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের টার্গেট ছিল ফুটপাথের অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা। দেখলাম এর একটি রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে। এই চাঁদা নেয় রাজনৈতিক লোকজন, পুলিশ ও লাইনম্যানরা। লাইনম্যানরা আবার পুলিশের নিয়োগ করা। আমরা প্রস্তাব করেছিলাম, সিটি করপোরেশন যদি এটা রেগুলারাইজ করে ট্যাক্স হিসেবে নেয় তা হলে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে এবং সরকারের আয় হবে।’
ওই গবেষণায় বলা হয়, ফুটপাথে চার বর্গফুট জায়গার জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। আর প্রতিটি লাইটের জন্য প্রতিদিন নেওয়া হয় ২৫ টাকা করে। মাসে ২ হাজার টাকা।
এই গবেষক বলেন, নতুন করে কোনো গবেষণা না হলেও পর্যবেক্ষণ বলছে, এখন হকার বেড়েছে। চাঁদার আকারও বেড়েছে। আর আগের অবস্থাই বহাল আছে। পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা এবং লাইনম্যানরাই এখনও ফুটপাথের চাঁদা নিয়ন্ত্রণ করে।
হকার লীগের সভাপতি আবুল কাসেম জানান, এখন ঢাকা শহরে সাড়ে ৩ লাখ হকার আছে। তাদের কাছ থেকে সর্বনিম্ন প্রতিদিন ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা নেয়া হয়। এটা এলাকা এবং আকারের ওপর নির্ভর করে। গড়ে কমপক্ষে ৩০০ টাকা চাঁদা আদায় হয় প্রতিদিন প্রতিজন হকারের কাছ থেকে। আর ঈদের আগের এক মাস এই রেট বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, ঈদকে টার্গেট করে চলতি মাসে সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা টার্গেট নিয়ে চাঁদা তুলছে হকারদের কাছ থেকে। রাজধানী থেকে প্রতিদিন এখন হকারদের কাছ থেকে চাঁদা নেয়া হয় ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বছরে ৩ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা।
এই হকার নেতা জানান, ঢাকার নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকায় মোট ৫ থেকে ৬ হাজার হকার আছে। এখান থেকে প্রতিদিন চাঁদা আসে কমপক্ষে ২৫ লাখ টাকা। তাই এখানে এক দিন দোকান বা ফুটপাথ বন্ধ থাকলে যারা এই চাঁদা নেন তাদের বিরাট ক্ষতি হয়।
এই চাঁদা কারা নেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, কতিপয় পুলিশ, সিটি করপোরেশনের লোক এবং ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ে কিছু রাজনৈতিক নেতা। আর এই টাকা তোলার জন্য লাইনম্যান ও ক্যাশিয়ার আছে। লাইনম্যান ও ক্যাশিয়ার ঠিক করে দেয় পুলিশ। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তাদের পরিবর্তন হয় না। তাদের কাজ সরকারি চাকরির মতো।
জানা গেছে, একজন লাইনম্যানের অধীনে একটি করে ‘ফুট’ থাকে। একটি ফুটে সর্বোচ্চ ৩০০ হকার বসতে পারে। তাদের একটি করে চৌকির জায়গা (দুই হাত বাই চার হাত) বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে ফুটপাথ ছাড়াও সরাসরি রাস্তায়ও হকারদের বসতে দেয়া হয়। আর আছে ভ্রাম্যমাণ বরাদ্দ।
এ বিষয়ে আবুল কাসেম বলেন, নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে পুলিশের ব্যবসায়ীদের পক্ষ নেয়া এবং সঠিক সময়ে পুলিশ না যাওয়ার পেছনে আছে এই ফুটপাথের চাঁদা। কারণ ফুটপাথের দোকান এক দিন বন্ধ থাকলে যারা চাঁদা দেন তাদের অনেক ক্ষতি। ঈদের আগে তো আরও বেশি ক্ষতি।
হকার নেতা মুরশিকল ইসলাম বলেন, এটার বড় সুবিধাভোগী হলো প্রশাসন। লাভের জন্য তারাই চাঁদার বিনিময়ে এই ফুটপাথ ভাড়া দেয়া টিকিয়ে রেখেছে। তবে প্রশাসনের কারা এটা সবাই জানে। সুনির্দিষ্ট করে বলতে চাই না। বললে হকাররা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী নেতাদের একজন নাম প্রকাশ না করে বলেন, মার্কেটের বিষয়গুলো দেখভাল করলেও বাইরের হকারদের সমিতির নেতারাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সেখান থেকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতা ও পুলিশের কাছে চাঁদার টাকা চলে যায়।
কীভাবে এই চাঁদা তোলা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমত আমরা একজন লাইনম্যান নিয়োগ দিয়ে থাকি। প্রতিটা পয়েন্টে লাইনম্যান রয়েছে। ওই লাইম্যানদের মাধ্যমে চাঁদা তোলা হয়। তিনি আরও বলেন, প্রতিটা দোকানে আলাদা আলাদা স্পেস দেয়া আছে। কাপড়ের জন্য ও জুতা বিক্রির জন্য কোনো কোনোটা ৩ ফিট আবার কোনোটা ৬ ফিট। ৩ ফিটের জন্য দৈনিক ৫০০ টাকা। আর ৬ ফিটের জন্য চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার টাকা। এর মধ্যে লাইনম্যানকে আলাদা অর্থ দিতে হয়।
বিদ্যুতের লাইন না থাকলেও অবৈধভাবে ব্যবহার করা হয় ওই বিদ্যুৎ। নিউমার্কেট থেকে ঢাকা কলেজ পর্যন্ত প্রতিদিন ১৫ কোটি টাকা তোলা হয়। এতে মাসে তোলা হয় ৪৫০ কোটি টাকার অধিক। তবে ঈদ মৌসুমে এই চাঁদা তোলা হয়। ঈদের পর কিছুটা কমে আসবে।
ওই ব্যবসায়ী নেতা আরও জানান, প্রতিদিন যে টাকা আদায় করা হয় সেই টাকা আলাদা একটি অ্যাকাউন্টে রাখা হয়। প্রতি সপ্তাহ বা মাসিক হিসেবে আদায় করা চাঁদার টাকা সমিতির মাধ্যমেই বণ্টন করা হয়। সেই চাঁদার ভাগ পান ভিআইপি নেতা থেকে স্থানীয় যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ। সেই চাঁদা থেকে ব্যবসায়ী সমিতি ভাগ বসায়।
এক ব্যবসায়ী বলেন, ফুটপাথে ব্যবসা করি চাঁদা দিয়ে। চাঁদা দেয়ার পরও একটু ব্যত্যয় ঘটলে পুলিশ লাঠিপেটা করে। তিনি বলেন, মাত্র তিন ফিট জায়গায় দোকান করছি। এর জন্য গুনতে হয় প্রতিদিন ৪শ টাকা। এরপর বিদ্যুৎ বিল ও নিরাপত্তাকর্মীর বিল তো আছেই।
কার কাছে এই চাঁদা দেয়া হয় এমন প্রশ্নের জবাবে সালাম বলেন, তার নাম বলতে পারব না। বললে সমস্যা আছে। ফুটপাথের আরেক দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্ধারিত হারে চাঁদা দেয়া হলেও পুলিশের কথা বলে লাইনম্যানরা অতিরিক্ত চাঁদা তুলে নিয়ে যায়। বাড়তি চাঁদা না দেয়া হলে দোকান থেকে বের করে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। না পেরে ওই চাঁদার টাকা দিতে বাধ্য হই।
গুলিস্তানে খদ্দেরহাট মার্কেটের সামনে ফুটপাথ দখল করে দোকানদারি করছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব একজন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সামনে ঈদ, তবে বেচা-বিক্রি কম। দোকান ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, প্রতিদিন ৮০০ টাকা দিতে হয়। এরপর আছে লাইনম্যান ও বিদ্যুৎ বিল। কারা নেন এই চাঁদার টাকা, তাদের কোনো সংগঠন বা সমিতি আছে কি না। তিনি বলেন, এখানে কোনো সমিতি নেই। শুনছি লাইনম্যানের মাধ্যমে নেতারা ও পুলিশ নিয়ে যায় সেই চাঁদার টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই চাঁদার টাকা তোলেন সেখানকার প্রভাবশালী নেতারা। আওয়ামী লীগ অফিসের লাগোয়া বিভিন্ন সংগঠনের নামে ওই চাঁদা তোলা হয়। এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিদিনের চাঁদার টাকা রাখা হয় কয়েকটি ভাগে। একটি ভাগ পান আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। আরেকটি ভাগ পায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগ। পুলিশের চাঁদার টাকা আওয়ামী লীগ নেতারাই দিয়ে থাকেন।
চাঁদাবাজির বিষয়ে পুলিশ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। জানতে কথা হয় নিউমার্কেট জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) বলেন, পুলিশের চাঁদাবাজির তথ্য সঠিক নয়। যারা এমন অভিযোগ তুলেছেন, তারা মিথ্যা বলেছেন। তিনি বলেন, সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত হলে আধা ঘণ্টার মধ্যে রাজধানীর সব ফুটপাথ সরানো সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো সম্মিলিত ভাবে সিদ্ধান্ত আসতে হবে কেনো? ফুটপাত দখল করে মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা যদি অবৈধ হয় তাহলে এই অবৈধ কাজে পুলিশের সায় থাকবে কেনো ? এমন প্রশ্নের কোনো জবাব নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

three × three =

সবচেয়ে আলোচিত