ঢাকা   মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১০ কার্তিক ১৪২৮   রাত ২:০৮ 

সর্বশেষ সংবাদ

বাইরের আইনজীবী দিয়ে মামলা পরিচালনায় দুদকের খরচ হচ্ছে কয়েক কোটি টাকা, হারছে মামলাতেও ; ফাঁস হয়ে যায় গোপন তথ্য

দুর্নীতি দমন কমিশনের নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট না থাকায়, ভাড়া করা আইনজীবী দিয়ে মামলা পরিচালনার পেছনেই বছরে খরচ হয়ে যাচ্ছে কয়েক কোটি টাকা। আর এসব আইনজীবী দিয়ে মামলা পরিচালনা করে দুদক আশানুরূপ সফলতা পাচ্ছে না। অনেকক্ষেত্রে মামলার গোপন তথ্য আগেভাগে চলে যায় আসামীপক্ষের হাতে। ফলে বেশিরভাগ মামলাতেই হেরে যাচ্ছে দুদক। যদিও দুদক আইনে নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো গত ১৭ বছরেও এই আইন বাস্তবায়ন হয় নি। বেশিরভাগ মামলাতে হেরে যাওয়ায় দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যায়ের কর্মকর্তারা হতাশ হয়ে পড়ছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিচারিক আদালতে ৫৩ ভাগ এবং উচ্চ আদালতে ৯৫ ভাগ মামলাতেই হেরে যাচ্ছে দুদক।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪’র ৩৩ ধারায় দুদকের নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের কথা বলা হয়েছে। আইনের ৩৩ (১) উপ-ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অধীন কমিশন কর্তৃক তদন্তকৃত এবং স্পেশাল জজ কর্তৃক বিচারযোগ্য মামলাগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রসিকিউটরের সমন্বয়ে কমিশনের অধীন উহার নিজস্ব একটি স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট থাকিবে।’ অর্থাৎ এই আইনের আওতায় দুদকের নিয়োগকৃত স্থায়ী আইনজীবী বা আইনকর্মকর্তা থাকবে। যারা দুদকের মামলা পরিচালনা করবেন। কিন্তু গত ১৭ বছরে ৫টি কমিশন গঠিত হলেও কোনো কমিশনই আইনের এ অংশটি কার্যকর করেনি। নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালালেও রহস্যজনক কারণে তা বেশিদূর এগুতে পারেনি। বর্তমানে দুদকের মামলা পরিচালনায় আইনের ৩৩ (৩) ধারা প্রয়োগ হচ্ছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, ‘কমিশনের নিজস্ব প্রসিকিউটর নিযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত কমিশন কর্তৃক অস্থায়ী ভিত্তিতে নিযুক্ত বা অনুমোদিত আইনজীবীগণ এই আইনের অধীন মামলাসমূহ পরিচালনা করিবে।“
আইনের এই ক্ষমতাবলেই দুদকের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবীদের একটি প্যানেল তৈরী করা হয়েছে । তারাই আদালতে মামলা পরিচালনা করেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, বেশিরভাগ আইনজীবী পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন না হওয়ায় এবং ক্ষমতাবান আসামীরা তাদের পক্ষে বড় বড় আইনজীবী নিয়োগ করায় আইনী লড়াইয়ে পারছেন না দুদকের আইনজীবীরা। ফলে অধিকাংশ মামলায় হেরে যেতে হয়। আর হারলেও এসব প্যানেল আইনজীবীদের কোনো দায় থাকে না। দুদকও তাদেরকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে না।
দুদকের উচ্চ পর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, বিচারিক এবং উচ্চ আদালতে কোথায় কতজন আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হবে- তাদের মানদণ্ড কী হবে- এমন একটি নীতিমালা থাকলেও সেটা অনুসৃত হয় না।
দুদক থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, কমিশন প্রতিষ্ঠার পর প্রথম ১০ বছরে দুদক ৩ হাজার ৬শ’ ৬২টি মামলা দায়ের করেছে। এর মধ্যে বিচারের জন্য আদালতে উঠেছে ৩ হাজার ১২টি মামলা। এসব মামলায় বিভিন্ন আদালতে দুদকের পক্ষে আইনি লড়াইয়ের জন্য যেসব প্যানেল আইনজীবী রয়েছেন, এর মধ্যে ঢাকার বিশেষ আদালতে ১৩ জন, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে ৩৯ জন এবং অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড হিসেবে রয়েছেন ৭ জন। ঢাকার বাইরেও দুদকের নিয়োগকৃত আইনজীবী রয়েছেন। তাদের সঙ্গে দুদকের রয়েছে মামলাভিত্তিক (কেস টু কেস) চুক্তি। অর্থাৎ মামলা অনুসারে তাদের ফি বা অর্থ পরিশোধ করা হয়। সূত্র মতে, ২০১১-২০১২ অর্থ বছরে প্যানেল আইনজীবীদের ফি বাবদ দিতে হয়েছে ৩ কোটি ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৩৫৩ টাকা। ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৫ হাজার ৩৯০ টাকা। ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরে আইনজীবীদের দেয়া হয় ৪ কোটি ৬২ লাখ ৯৭ হাজার ৭২১ টাকা। অর্থাৎ বছরে গড়ে সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৪ কোটি টাকা শুধু আইনজীবীদের মামলা খরচ দিতে হয়।

এতো অর্থ খরচ করেও দুদক আশানুরূপ ফল পাচ্ছে না। বিচারিক আদালতে ৫৩ শতাংশ মামলায় হেরে যাচ্ছে। আর যে গুলোতে জিতলেও অর্থাৎ আসামীর সাজা হলেও উচ্চ আদালতে এসব সাজা টিকছে না। উচ্চ আদালতে দুদকের মামলায় হারের সংখ্যা বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী যা ৯৫ শতাংশ। বিচারিক আদালত বা উচ্চতর আদালত পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ে দুদক হেরে গেলেও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারেনা দুদক। খুব বেশী হলে ওই আইনজীবীকে প্যানেল থেকে বাদ দেয়া হয়।
সূত্র জানায়, যোগ্যতার চেয়েও রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তি সম্পর্ক, তদবির ও অনুরোধের ভিত্তিতে দুদকে আইনজীবী নিয়োগ পেয়ে যান। সততা, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও যোগ্যতার মানদণ্ড বিবেচনায় আসছে না। দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পছন্দের আইনজীবী নিয়োগের ঘটনাও ঘটছে। এ ছাড়া অনেক আইনজীবী প্রকাশ্যে দুদকের পক্ষে আর নেপথ্যে আসামিপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ পর্যন্ত ওঠে। অনেকের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের সুবিধা অনুযায়ী শুনানিতে বার বার তারিখ চাওয়া, আদালতে দুদকের সাক্ষীকে অনুপস্থিত দেখানো, জামিনে যথাযথ বিরোধিতা না করা, রেকর্ডপত্র উপস্থাপন না করার মতো নানা কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ ওঠে। এই আনৈতিক ভূমিকার কারণে দুদকের অনেক গোপন তথ্য এবং মামলার আইনী ফাঁকফোকর আসামীপক্ষ জেনে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, যদি দুদকের নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট থাকতো তা হলে এ সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো না।
এসব বিষয় নিয়ে দুদক কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খানের সঙ্গে কথা বললে ,তিনি জানান এ সমস্যাটি নিয়ে তারাও ভাবছেন। তিনি বলেন, দুদকের নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট অবশ্যই থাকা দরকার। এটা কি ভাবে কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে কমিশনের সভায় আলোচনা হবে বলে জানান তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

4 × 1 =

সবচেয়ে আলোচিত