ঢাকা   রবিবার, ২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯   সন্ধ্যা ৭:৪৫ 

সর্বশেষ সংবাদ

অসহযোগিতার সঙ্গে যৌন হয়রানিরও শিকার হন নারী ইউএনওরা: টিআইবির জরিপ

দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) অসহযোগিতা ও প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি যৌন হয়রানিরও শিকার হন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক জরিপে এমন তথ্য ওঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার ‘স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উপজেলা নারী নির্বাহী কর্মকর্তার চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
টিআইবি বলছে, উন্নয়ন কার্যাবলী তদারকিসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের সময় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ ইউএনও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে এ জরিপে তারা অভিযোগ পেয়েছে।
ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রাক্তন ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাহিদ শারমীন।
তিনি বলেন, ২০২০ সালের জুন মাসের তথ্যের ভিত্তিতে দেশের ৪৮৫টি উপজেলার মধ্যে ১৪৯টি উপজেলায় কর্মরত নারী ইউএনওকে জরিপের জন্য ই-মেইলে প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে ৪৫ জন জরিপে অংশ নেন।
এছাড়া, গুণগত তথ্য সংগ্রহ করার জন্য মুখ্য তথ্যদাতা হিসেবে নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, উপজেলা পর্যায়ে অন্যান্য সরকারি অফিসের কর্মকর্তা এবং প্রশাসন ক্যাডারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদে সাচিবিক সহায়তা দিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারী ইউএনওরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে আসা ‘অবৈধ আর্থিক সুবিধার’ কারণে অনুমোদন সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন।
জরিপে অংশগ্রহণকারী ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ ইউএনও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে অনিয়ম করতে চাপের মুখে পড়ার কথা বলেছেন। ২০ শতাংশ ইউএনও বলেছেন, অতিরিক্ত ত্রাণ সামগ্রীর জন্য সুপারিশ করতে তাদের বাধ্য হতে হয়।
এছাড়া, ব্যয়ের যথার্থতা যাচাই না করতে বিভিন্ন মহল থেকে চাপ আসার কথা বলেছেন ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা। ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ নারী ইউএনও ভুয়া ব্যয়ের বিল অনুমোদন এবং ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ নারী ইউএনও উপজেলা পরিষদের ক্রয় সংক্রান্ত কাজে অনিয়ম করতে বাধ্য করার কথা বলেছেন।
২৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ নারী ইউএনও দায়িত্ব পালনে সহকর্মীদের পক্ষ থেকে এবং ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে উপজেলা চেয়ারম্যানের ‘অসহযোগিতার’ সম্মুখীন হওয়ার কথা বলেছেন।

৩১ দশমিক ৪ শতাংশ ইউএনও দুর্নীতিবিরোধী কাজের ক্ষেত্রে ‘প্রতিবন্ধকতা’, সমান সংখ্যক ইউএনও বিভিন্ন মহল থেকে ‘অনৈতিক কাজের জন্য চাপ’, ৩১ শতাংশ উত্তরদাতা ‘রাজনৈতিক প্রভাব’ এবং ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ ইউএনও উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজে বাধার সম্মুখীন হওয়ার অভিযোগ দিয়েছেন।
সরকারের বিভিন্ন বিভাগের দপ্তরের সাথে সমন্বয়হীনতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে অসহযোগিতার কথা বলেছেন ৩১ শতাংশ ইউএনও।
এছাড়া, ৭ দশমিক ১০ শতাংশ ইউএনও জেলা প্রশাসন থেকে যথাসময়ে সহযোগিতা না পাওয়া ও ১১ দশমিক ৯ শতাংশ ইউএনও স্থানীয় সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা সচিবের ‘প্রভাব খাটানোর’ কথা জানিয়েছেন।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগ মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন ৯৮ শতাংশ ইউএনও। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়ার কথা বলেছেন ৯১ শতাংশ।
যাদের মধ্যে ৭৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রয়োজনীয় বাজেটের অভাব, ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসহযোগিতা, ২২ দশমিক ৯ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণে দুর্নীতি, ২০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহের অসহযোগিতা এবং ৫ দশমিক ৭ শতাংশ ইউএনও মেডিকেলের সুরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের দুর্নীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কথা বলেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষে ৮৯ দশমিক ১ শতাংশ নারী ইউএনও পদক্ষেপ নিবলেও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
দুর্নীতির বিরদ্ধে পদক্ষেপ নিতে গেলে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনীতিবিদদের চাপের মুখে পড়ার কথা জানিয়েছেন ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ ইউএনও।
উল্টো দুর্নীতির বিরদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তাদের বিরদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয় বলে জানিয়েছেন ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা।
৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ ইউএনও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, এমনকি সাংবাদিকের মাধ্যমেও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়ার কথা বলেছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসহযোগিতার কারণে ৫০ শতাংশ, স্থানীয় রাজনীতিবিদদের কারণে ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ , উপজেলা পরিষদের অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তার দ্বারা ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ, জেলা প্রশাসকের কারণে ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের কারণে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ ও সাধারণ জনগণের কারণে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ ইউএনও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন বলে উঠে এসেছে জরিপে।
স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নারী ইউএনওদের ভূমিকা আরও কার্যকর করতে আট দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী ইউএনওদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দূর করার জন্য উপজেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা পরিষদের অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে নারীর প্রতি সংবেদনশীল আচরণের ওপর প্রশিক্ষণের আয়োজন করা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের এসিআরে জেন্ডার সংবেদশীলতাকে একটি সূচক হিসেবে রাখা দরকার।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে সাচিবিক সহায়তা দেওয়ার কাজে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ইউএনও এবং চেয়ারম্যানদের নিয়ে ওরিয়েন্টেশনের আয়োজন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
টিআইবি বলছে, দুর্নীতি প্রতিরোধে পদক্ষেপের জন্য নারী ইউএনওদের জেলা পর্যায়ে সম্মানিত করা এবং পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সংবাদমাধ্যমগুলোকে স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যথাসাধ্য সঠিক সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে ইউএনওর কার্যক্রম সম্পাদনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা দিতে হবে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দেশে কর্মরত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের এক তৃতীয়াংশ নারী। এটা নারীর ক্ষমতায়নের একটি দৃষ্টান্ত। তারপরও নারী পরিচয়ের কারণে কর্মক্ষেত্রে তাদের যে প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ, তা এই ইতিবাচক অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছে।
“আমাদের প্রশাসনিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিবেশ জেন্ডার সংবেদনশীল নয়, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক।
”নারী ইউএনওকে একজন মানুষ বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে না দেখে মূলত নারী হিসেবে দেখার প্রবণতা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।”
সাংবাদিকদের কারণেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারী ইউএনওরা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন বলে উঠে এসেছে গবেষণায়।
এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সাংবাদিকতার অনেক ভালো দৃষ্টান্ত রয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের সাথে যোগসাজশে স্থানীয় সাংবাদিকরা অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়ে থাকেন।
”এক্ষেত্রে স্থানীয় সাংবাদিকদের পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা বা অন্যান্য সুবিধাদি না পাওয়া, এবং তাদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের মতো বিষয়ও কাজ করে।”বিডি নিউজ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

four × one =

সবচেয়ে আলোচিত