ঢাকা   মঙ্গলবার, ৩ আগস্ট ২০২১, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮   বিকাল ৩:২৭ 

সর্বশেষ সংবাদ

প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যা: মিউটিনির বিচার প্রশ্নবিদ্ধ, হত্যা মামলার বিচার হয়নি, রায় বাতিল করে রিভিউ চেয়েছিলেন এডভোকেট সিরাজুল হক

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এ হত্যার মূল রহস্য যেমন উদঘাটিত হয়নি, তেমনি জিয়া হত্যার বিচারও হয়নি। সামরিক আদালতে যে বিচার হয়েছিলো তা ছিলো সেনা অভ্যুত্থান তথা মিউটিনির। সেই বিচার নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। কিন্তু বেসামরিক আদালতে হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় জিয়া হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কে বা কারা ছিলো তা রহস্যঘেরাই রয়ে গেছে।

জিয়া হত্যার মূল রহস্য কী ছিল, সেই হত্যার বিচার নিয়ে কেনো কোনো উদ্যোগই নেয়নি বিএনপি? অথচ দলটি ক্ষমতায় ছিলো কয়েকবার। বিএনপির এই অনীহা কেন? এ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন নানা রহস্য। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতায় ছিলো বিএনপিই। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। তিনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়ার বিশ্বস্থ। কিন্তু তিনিও উদ্যোগ নেননি দেশের রাষ্ট্রপতি হত্যার। বরং সেনাপ্রধান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের নির্দেশে তড়িঘড়ি করে সামরিক আদালত গঠন করে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা সেনাকর্মকর্তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে মিউটিনির অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু জিয়াউর রহমান যখন নিহত হন তখন তিনি সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন না।
১৩ সেনাকর্মকর্তাকে সামরিক আদালতে বিচারের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট করেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। এই রিটের শুনানিতে আসামী পক্ষে ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী সিরাজুল হক, ড.কামাল হোসেন, এডভোকেট খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহম্মদ, ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, ড.এম জহির, এডভোকেট আমিনুল হক প্রমুখ। শুনানিতে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে তাদের সব যুক্তি খারিজ করে দিয়ে সামরিক আদালতের রায় বহাল রাখে। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড এবং ১৩ সেনাকর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ডের পর এ নিয়ে কথা বলছিলেন আইনজীবীরা। তাদেরই একজন প্রখ্যাত আইনজীবী সিরাজুল হক। যিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী ছিলেন। লেখক গবেষক আনোয়ার কবির লিখিত “ফাঁসির মঞ্চে তেরজন” গ্রন্থে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও সঠিক বিচার হয়নি। হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মিউটিনির চার্জ গঠন করা ঠিক হয়নি। তৎকালিন রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হত্যাকাণ্ডের আইনেই সাধারণ আদালতে এঁদের বিচার করা উচিত ছিলো। “আইন আদালত” পত্রিকার পাঠকদের জন্য বিশিষ্ট আইনজীবীরা সেদিন কি বলেছিলেন তা তুলে ধরা হবে। এ পর্বে রয়েছে প্রখ্যাত আইনজীবী প্রয়াত সিরাজুল হক যা বলেছিলেন তার বিস্তারিত।


এডভোকেট সিরাজুল হক স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও সঠিক বিচার হয়নি। হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মিউটিনির চার্জ গঠন করা ঠিক হয়নি। তৎকালিন রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হত্যাকাণ্ডের আইনেই সাধারণ আদালতে এঁদের বিচার করা উচিত ছিলো।
আদালতে তাঁর মতামত ছিলো ,চট্টগ্রাম সেনাবিদ্রোহ মামলার নামে ১৩ জনের ব্যাপারে সামরিক আদালতে যে বিচার হয়েছে সেটি আর্মি আ্যক্ট অনুযায়ী ঠিক হয়নি। এঁদের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে মিউটিনির চার্জে বিচার করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় What is mutiny?
মিলিটারি অ্যাক্টে বলা হয়েছে-
The term mutiny implies collective insubordination, or a combination of two or more persons to resist, or to induce other to resist, military authority.
দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো-Is murder as such mutiny?
তৃতীয় প্রশ্ন হলো-Is murder of a President of a country mutiny?
এ ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডটি মিউটিনির পর্যায়ে পড়ে কি নি? এখানে বলা যায় রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ডটি একটি হত্যাকাণ্ডই। মিউটিনি নয়। হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মিউটিনির চার্জ গঠন করা ঠিক হয়নি। তৎকালীন রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হত্যাকাণ্ডের আইনেই সাধারণ আদালতে এঁদের বিচার করা উচিত ছিলো।
এডভোকেট সিরাজুল হক বলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যাপারে তৎকালিন রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সঠিক তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের সেনাবাহিনী থেকে বহিস্কার করে সাধারণ আদালতের কাছে সোপর্দ করা উচত ছিলো। আমার মতে আইনত এটিই ছিলো শুদ্ধ পদ্ধতি। তা না করে কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ডটিকে মিউটিনির পর্যায়ে ফেলে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিচার করেছেন ।এটি আইনত শুদ্ধ বলে আমি মনে করি না।
এ ছাড়াও জিয়া হত্যাকাণ্ডের সামরিক আদালতের চার্জ গঠন সম্পর্কে বলা যায় ,আর্মি আ্যক্টের ৫৯(২) ধারাতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি খুন হয়েছেন তিনি যদি মিলিটারী আ্যক্টের আওতায় না পড়েন তা হলে তার বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শাল করা যায় না। Army act 59(2)-A Person subject to this Act (Army act) who commits an offence of murder against a Person not subject to this Act or to the Indian Air force Act 1932,or to the Pakistan Navy ordinance ,1961 and Pakistan Air force act 1953 or of Culpable homicide not amounting to murder against such a Person or of rape in relation to such a Person, shall not be deemed to be guilty of an offence against this Act and shall not be dealt with under this Act unless he commits any of the said offences while on active service).
এখন বিবেচ্য বিষয় যে ব্যক্তি নিহত হয়েছেন তিনি আর্মি আ্যক্টের আওতাভূক্ত কি না। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি একজন সিভিল ব্যক্তি ছিলেন। তার কর্তব্য আর্মি আ্যক্টের দ্বারা পরিচালিত নয়। তিনি সংবিধান কর্তৃক গঠিত ও পরিচালিত ব্যক্তি। তিনি কমান্ডার ইন চীফ হলেও আর্মির আ্যক্টিভ সার্ভিসে পড়েন না। সুতরাং মার্ডার অব এ প্রেসিডেন্ট ইজ নট এ মিউটিনি এন্ড সাচ মার্ডার কেননট বি ট্রায়াল্ড বাই কোর্ট মার্শাল আন্ডার দি আর্মি আ্যক্ট।
সিরাজুল হক বলেন, সেদিন ১৯৮১ সালে আমরা যখন উচ্চ আদালতে তেরজনের মামলার ব্যাপারে যে বক্তব্য পেশ করেছিলাম এবং আমি যে আর্গুমেন্ট করেছিলাম সেখানে বলেছিলাম, It was Contended that this was no trial because there was no mutiny and the murder of the President being a civil offence as opposed to military offence was not Cognizable by Court Martial.- সেদিন আদালত আমার বক্তব্যটি শুধু রেকর্ডই করেছেন কিন্তু সুচিন্তিতভাবে বিবেচনায় আনেন নি। তবে আদালত তার প্রদত্ত রায়ের ফাইন্ডিং এ বলেছিলেন যদি মামলাটি কোরাম নন জুডিশ হয় কিংবা মেলাফাইডি হয় তবেই কোর্ট মার্শালের ওপর হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ করতে পারে,নতুবা পারে না। এ মন্তব্যের উপরই আদালত আসামিদের আবেদন খারিজ করে দেন। সেদিন আমার বক্তব্যে এটিও ছিলো মার্শাল ‘ল’ কোর্টের এই বিচারটিতে কোরাম নন জুডিস এবং মেলাফাইডি ছিলো।

বর্তমানে যদি আবারো এই বিচারটির সঠিক ট্রায়াল করতে হয় তবে সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্টের দেয়া আগের রায়টি রিভিউ করতে পারে। রিভিউর এই প্রক্রিয়ায় আমাদের সকল আইনজীবীর বক্তব্য গ্রহণ করলে ওই রায়টি বাতিল হতে পারে। রায়টি বাতিল হলে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামিদের আত্মীয় স্বজনদের জন্য সরকার ইচ্ছে করলে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে পারেন। এই প্রক্রিয়াতেই সত্যিকারের খুনীদেরকে তদন্তপূর্বক বিচার করা যেতে পারে। আমার মতে এটিই হবে প্রকৃত ন্যায় বিচার। এ প্রক্রিয়ায় দেশের ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন সমুন্নত থাকবে। এতে দেশ একটি ঐতিহাসিক প্রয়োজনকে পূরণ করবে।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

সবচেয়ে আলোচিত