ঢাকা   শুক্রবার, ৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯   রাত ১:৫১ 

সর্বশেষ সংবাদ

দুদকের মামলায় বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা শহীদ খানের আরও তিন বছরের কারাদণ্ড

দুর্নীতি দমন কমিশন, দুদকের আরও একটি মামলায় বরখাস্তকৃত সেনাকর্মকর্তা লেফটেনেন্ট কর্নেল মো. শহিদ উদ্দিন খানের তিন বছরের কারাদণ্ডের রায় দিয়েছে আদালত। মঙ্গলবার ঢাকার ৯ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে আসামির ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং জরিমানা অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
দণ্ডিত আসামি পলাতক রয়েছেন। রায় ঘোষণার পর আদালত আসামির বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
দুদকের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী প্রসিকিউটর রফিকুল হক বেনু জানান মামলাটিতে আদালত গত ৮ আগস্ট চার্জগঠনের পর গত ২৩ আগস্ট এবং ৭ সেপ্টেম্বর ২ কার্যদিবসে ৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। এরপর মঙ্গলবার যুক্তিতর্কের পর রায় ঘোষণা করেন।
এর আগে ২০২০ সালের ১০ নভেম্বর অস্ত্র আইনের মামলায় শহীদ উদ্দিন খান, তার স্ত্রী ফারজানা আনজুম খানসহ চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেন আদালত। এরপর একই বছর ২০ ডিসেম্বর আয়কর ফাঁকির মামলায় শহীদ উদ্দিন খানের নয় বছরের কারাদণ্ডের রায় দেন আদালত।
দুদকের মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামি মো. শহিদ উদ্দিন খান ১৯৮৩ সালে সেনাবাহিনীতে অষ্টম বিএমএ দীর্ঘ মেয়াদী কোর্সে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন এবং ২০১০ সালে কর্নেল পদ থেকে অবসর নেন। তিনি ১৯৮৯ সালে মোসাম্মৎ ফারজানা আঞ্জুমকে বিয়ে করেন। তার শেহতাজ মানসী খান ও ফারিসা পিনহাজ খান নামে দুই মেয়ে সন্তান রয়েছে।
অভিযোগ অনুসন্ধানে জানা যায়, শহিদ উদ্দিন স্ত্রী-সন্তানসহ যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। রাজধানীর বারিধারা তার পরিবারের সদস্যদের নামে একটি ফ্ল্যাট এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডনে দুটি বাড়ি আছে, যার মূল্য কম-বেশি মোট ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তাছাড়া তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন ব্যাংকে ১২টি একাউন্ট রয়েছে। স্ত্রী-কন্যার নামে ঢাকাস্থ প্রচ্ছায়া লি. নামীয় ব্যবসায়েক প্রতিষ্ঠানে প্রতি শেয়ার ১০০/-হিসাবে ৫ কোটি টাকা মূল্যের ৫ লক্ষ শেয়ার এবং কুমিল্লায় কোটি টাকা মূল্যের বন্দীশাহী কোল্ড স্টোরেজ রয়েছে। লন্ডনেও তাদের নামে জুমানা ইনভেস্টমেন্টস অ্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেড নামে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং সাইপ্রাসেও ব্যাংক একাউন্ট রয়েছে।
শহীদের সহোদর ভাই মোহাম্মাদ আলী খানের নামে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে ব্যাংকে ৩০ লাখ ৩৯ হাজার দিরহাম জমা ছিল, যা জুমানা ইনভেষ্টমেন্টস অ্যান্ড প্রোপার্টিজ লি. নামে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তরিত হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য মতে জানা যায়, শহিদ উদ্দিন খানের নিজ নামে বা তার পরিবারের সদস্যদের নামে দেশে-বিদেশে কম-বেশি ৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জন করাসহ বিদেশে তাদের নামে ১২টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে, যা একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে অস্বাভাবিক। অর্থাৎ তার/পরিবারের সদস্যদের নামে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ রয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়। এ কারণে তাকে ২০২০ সালের ১৬ আগস্ট সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ ইস্যু করা হয়। কিন্তু আসামি সম্পদের হিসাব দাখিল না করায় ২০২১ সালের ২৪ জানুয়ারি দুদকের উপপরিচালক জামাল উদ্দিন আহমেদ মামলাটি করেন। মামলায় একই কর্মকর্তা তদন্ত করে গত বছর ১৪ নভেম্বর চার্জশিট দাখিল করেন।
উল্লেখ্য এর আগে ২০২১ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আরেক মামলায় বরখাস্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল শহীদ উদ্দিন খান ও তার স্ত্রী ফারজানা আনজুমকে ১০ বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ছয় মাস কারাদণ্ডের রায় দিয়েছিলো ঢাকার আরেক আদালত।
ওই মামলার বিবরণীতে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের ১৫ই জানুয়ারি ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় শহীদ উদ্দিন খানের বাসায় অভিযান চালিয়ে দুইটি পিস্তল, ছয়টি গুলি, দুইটি শটগান ও তিন লাখ সমমানের জাল টাকা উদ্ধার করে পুলিশ।
এই ঘটনায় ১৭ই জানুয়ারি কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট শহীদ উদ্দিন খানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে নগদ ও জাল টাকা উদ্ধার করায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেন। এছাড়া, অস্ত্র আইনেও একটি মামলা করা হয়।
অস্ত্র আইনে দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়, অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে সরকার ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
অস্ত্র আইনের একটি মামলায় এর আগে ২০২০ সালের ১০ই নভেম্বর শহীদ উদ্দিন খান, তার স্ত্রী ফারজানা আনজুম খানসহ মোট চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।
আর বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় রায় ঘোষণা করা হলো আজ।
এছাড়া, ২০২০ সালের ২০শে ডিসেম্বর আয়কর ফাঁকির একটি মামলায় শহীদ উদ্দিন খানকে নয় বছরের কারাদণ্ড দেয় ঢাকার একটি আদালত।

আয়কর ফাঁকির মামলায় নথি থেকে জানান যায়,তিন অর্থবছরে ১৭ কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার ১০৭ টাকা আয়কর ফাঁকি দেয়ার অভিযোগে শহীদ উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালতে মামলা করেন সহকারী কর কমিশনার শেখ আলী হাসান।
মামলার কাগজপত্রের তথ্য বলছে, শহীদ উদ্দিন খান ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭৪ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৬ টাকার আয়ের তথ্য গোপন করে আয়কর ফাঁকির অপরাধ করেছেন। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শহীদ উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে ৯ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজার ৬০০ টাকা আয়ের তথ্য গোপন করে আয়কর ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ আনা হয়। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শহীদ উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে ৭ কোটি ৭ লাখ ১৪ হাজার ২২১ টাকা আয়ের তথ্য গোপন করার অভিযোগ আনা হয়।
তিনি আয়কর রিটার্ন দাখিলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রকৃত আয় ও সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তিনি আয়কর রিটার্ন দাখিল করেননি। মামলার আরজিতে তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ অর্থবছরে আটটি ব্যাংক হিসাবে শহীদ উদ্দিন খানের ১ কোটি ৩০ লাখ ১৫ হাজার ১৩২ টাকা জমা ছিল।
আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আটটি ব্যাংক হিসাবে ৭৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৬৮ টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ১২টি হিসাবে ২৯ কোটি ৮৭ লাখ ৮৪ হাজার ২৬৪ টাকা এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নয়টি ব্যাংক হিসাবে ৩৩ কোটি ২৪ লাখ ৬২ হাজার ৬৯৫ টাকা জমা ছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আটটি ব্যাংক হিসাবে জমা ছিল ৪০ কোটি ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৬৫ টাকা।
উল্লেখ্য দুর্নীতি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত শহীদ উদ্দিন খান পালিয়ে যুক্তরাজ্য চলে যান। সেখান থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

14 + two =

সবচেয়ে আলোচিত