সুপ্রিম কোর্ট বার ক্যান্টিনে ‘গরুর মাংস’ বিতর্ক; পেছনে রয়েছে রাজনীতি ও করোনা ভাইরাসের প্রভাব,বিব্রত সাধারণ আইনজীবীরা

0
397

বিষয়টা অনেকটা ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’ এর মতো অবস্থা। মহামারি করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত পৃথিবী। হাজারে হাজারে মানুষ মরে যাচ্ছে, আক্রান্ত হচ্ছে। অফিস, আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে মানুষ। দেশের অর্থনীতি পর্যুদস্ত। জীবনের নিশ্চয়তা নেই। করোনায় আক্রান্ত হয়ে কে কখন মারা যাবেন তারও ঠিক ঠিকানা নেই। দিনের পর দিন লকডাউন চলছে। আদালত পাড়া বন্ধ। মামলা মোকদ্দমার শুনানি হচ্ছে না। উচ্চ আদালতে ভার্চুয়াল বেঞ্চ বসে। তাতে সীমিত সংখ্যক মামলার শুনানি হলেও, নিম্ন আদালত একেবারেই বন্ধ। বেশিরভাগ আইনজীবীই আর্থিক টানাপড়েনে আছেন। অনেককে কাটাতে হচ্ছে অলস সময়। এই যখন সার্বিক অবস্থা তখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের একটি অংশ এক ‘অদ্ভুত ইস্যু’ নিয়ে সরগরম করতে মাঠে নেমেছেন। আর এই ইস্যুটি হলো, সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির ক্যান্টিনে ‘গরুর মাংস’ রান্না হবে কি হবে না সে প্রশ্ন। কিছু আইনজীবীর ‘অদ্ভুত’ এ ইস্যু ও আচরণ নিয়ে বিব্রত দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীরা। তারা বলছেন, মামলা মোকদ্দমা না থাকায় অলস সময়ে কিছু আইনজীবী অযথাই সর্বোচ্চ আদালত অঙ্গনটিকে বিতর্কিত করতে চাচ্ছেন, হেয় করতে চাচ্ছেন। এতে সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত,আইনজীবী সমিতির চারজন সনাতন ধর্মাবলম্বী সদস্য আইনজীবী ঐক্য পরিষদ নামে একটি সংগঠনের পক্ষে ৩০ মে সমিতির সম্পাদকের কাছে এক আবেদন দিয়ে জানান, গত ২৯ মে রাতে সুপ্রিম কোর্ট বার ক্যান্টিনে গো মাংস রান্না করা হয়, রাতে তা খাবারের জন্য পরিবেশন করা হয়। পরদিন ৩০ মে সকালেও গোমাংস রান্না করা হয় এবং তা খাবারের জন্য পরিবেশন করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ঐতিহ্যগতভাবেই এর সৃষ্টিলগ্ন হতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকায় কখনোই গো মাংস রান্না ও পরিবেশন করা হয় নাই। তাই সুপ্রিম কোর্ট ক্যান্টিনে গরুর মাংস রান্না বন্ধ রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা চান তারা। যে চারজন আইনজীবী এ আবেদন জানান তারা হলেন, আইনজীবী ঐক্য পরিষদ সুপ্রিম কোর্ট শাখার সভাপতি বিভাস চন্দ্র বিশ্বাস,পরিষদের সম্পাদক অনুপ কুমার সাহা, আইনজীবী সমিতির বিজয়া পুনর্মিলনী ও বাণী অর্চনা পরিষদের আহবায়ক জয়া ভট্টাচার্য্য এবং সদস্য সচিব মিন্টু চন্দ্র দাস ।
এ ঘটনায় বিব্রত সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবীরা। নেটিজনদের মধ্যেও চলছে এ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা সমালোচনা। একপক্ষ বলছেন, সুপ্রিমকোর্ট বারে ৭৩ বছরের ঐতিহ্য অনুযায়ী গরুর মাংস রান্না বা পরিবেশন করা হয় না। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই এটা করা হয়। কিন্তু এখন এমন কি হলো যে এ শ্রদ্ধাবোধ ওঠে যাবে? এ ছাড়া বারের ক্যান্টিন ছাড়া ব্যক্তিমালিকানাধিন ক্যান্টিন রয়েছে, সেগুলোতে গরুর মাংস পরিবেশনে কোনো বাধা নেই। কেউ গরুর মাংস খেতে চাইলে সেখানে গিয়েও খেতে পারেন। বার পরিচালিত ক্যান্টিনেই কেনো রীতি ভাংতে হবে? বিষয়টি সহজ নয় এবং এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক হীনমন্যতা রয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। আবার অনেকেই বলছেন, যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ট আইনজীবীই মুসলমান এবং তারা গরুর মাংস খেতে পছন্দ করেন ফলে, গরুর মাংস রান্না হতেই পারে। যার পছন্দ হয় খাবে যার পছন্দ হয়না খাবে না। কিন্তু আরেকজনের খাবার তো বন্ধ করার কথা বলতে পারেন না।পাল্টাপাল্টি এমন যুক্তিতে সরগরম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও।

এদিকে সমিতির ক্যান্টিনে গরুর মাংস রান্না বন্ধ করার আবেদন জানানোর এই বিতর্কের মধ্যেই মাহমুদুল হাসান নামে এক আইনজীবী গরুর মাংস রান্নার নির্দেশনা চেয়ে পাল্টা আবেদন জানিয়েছেন। বুধবার আইনজীবী সমিতির সম্পাদক বরাবর আবেদন করেন ওই আইনজীবী। এতে তিনি বলেন, গরুর মাংস বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং বৈধ একটি খাবার। বাংলাদেশের কোনো আইনে এই গরুর মাংসকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। স্বাস্থ্যগত দিক দিয়েও এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর। গরুর মাংসে পুষ্টিগুণ বিবেচনা করে এবং দেশের জনগণের প্রোটিন নিশ্চিত করতে সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ৪কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে “আধুনিক পদ্ধতিতে গরু হৃষ্টপুষ্ট করণ” প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আবেদনে আইনজীবী বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে, কোনো খাবার খাওয়া বা না-খাওয়া মানুষের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও রুচির বিষয়। স্বাস্থ্যগত কারণে বা বিশ্বাসজনিত কারণে কেউ গরুর মাংস অপছন্দ বা নাও খেতে পারেন। তাই বলে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে ক্যান্টিনগুলোতে গরুর মাংস রান্না বা বিক্রি হবে না, এ বিষয়গুলো অত্যন্ত অমানবিক। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক পরিশ্রম করেন। তাই আইনজীবীদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিতে বার অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে সব ক্যান্টিনে গরুর মাংস রান্না ও বিক্রি হওয়া আবশ্যক। পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত কারণে বা বিশ্বাসজনিত কারণে যারা গরুর মাংস খেতে চান না, তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখা উচিত।

অবশ্য আইনজীবীদের অনেকেই বলছেন, যুক্তি তর্ক যে দিকেই যাক, আসল কথা হচ্ছে করোনা ভাইরাসের কারণে আদালত বন্ধ থাকায় সর্বোচ্চ আদালতে এখন আইনজীবীদের ব্যস্ততা নেই। যে কয়েকজন আইনজীবী বারে যান তারা গল্পগুজব করে সময় কাটান। জরুরী দরকার ছাড়া কেউ সেখানে যাচ্ছেনও না। আইনজীবী ভবন থাকে সুনশান নীরবতা। ক্যান্টিনেও ভীড় নেই। তারপরও কেনো হঠাৎ করে গরুর মাংস রান্নার ইস্যুটি আসলো তা নিয়ে সন্দিহান অনেক আইনজীবী। তারা বলছেন, এটার পেছনে বারের রাজনীতিও কাজ করছে হয়তো। নবনির্বাচত সভাপতি আব্দুল মতিন খসরু করোনাভাইরাসে মারা যাওয়ার পর সমিতির কার্যকরী কমিটির সদস্যরা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সমিতির সদ্যসাবেক সভাপতি অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনকে সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছেন। আর এটি মানতে পারছেন না বিএনপি ও জামাতপন্থী আইনজীবীদের একাংশ। যার নেতৃত্বে রয়েছেন বারের সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল। এ নিয়ে দুপক্ষের বিরোধ এখন প্রকাশ্যে রূপলাভ করেছে। মঙ্গলবারও এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায়।
ক্যান্টিনের গরুর মাংস রান্না ও পরিবেশনের পেছনে কোনো উকালাতি প্যাচ কিংবা এমন রাজনীতি্ কাজ করছে কী না তা নিয়ে সন্দেহমুক্ত নন অনেক আইনজীবী। কারণ এ নিয়ে নানাভাবেই বিভাজন সৃষ্টি হতে পারে, যা থেকে সুযোগ নিতে চায় হয়তো কেউ কেউ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

three + 10 =