ঢাকা   সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯   রাত ৯:১৩ 

সর্বশেষ সংবাদ

ভালো নেই পাকিস্তানের করাচির ২০ লাখ বাঙালী, আনুগত্য দেখিয়েও তকমা জুটেছে মিরজাফরের, কাজে আসছে না ‘ধর্ম’

ভালো নেই পাকিস্তানের করাচিতে থাকা অন্তত ২০ লাখ বাঙালি। সেখানে তাদের থাকতে হচ্ছে অস্পৃশ্য,অবহেলায়। কাটাতে হচ্ছে মানবেতর জীবন। শুধু বাঙালী হওয়ার কারণে পাকিস্তানের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য দেখিয়েও তারা নাগরিকের মর্যাদা পাচ্ছেন না। জাতীয় পরিচয়পত্র মেলেনা, ফলে উচ্চশিক্ষা এবং সরকারি চাকরিও তাদের কপালে জুটে না। জমি বাড়ি কিনতে পারেন না। বাড়ি ভাড়া করে থাকতে হয়। ধর্মের কারণে যারা পাকিস্তানকে আপন ভেবে গিয়েছিলেন তাদের এখন ভুল ভাঙছে। শুধু ধর্ম তাদের বন্ধন সৃষ্টি করাতে পারে নি। ভিন দেশী তকমা আর বাঙালী হওয়ায় তারা পাকিস্তানে ‘মিরজাফর’ হিসেবে চিহ্নিত। পাকিস্তানে বাঙালিদের এই দুর্ভোগের চিত্র এসেছে বিবিসিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
পাকিস্তানের বন্দর শহর করাচি। দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত এবং সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর। ২০১৭ সালে ‘দ্য ইকোনোমিস্ট’ পত্রিকার ইনটেলিজেন্স ইউনিট-এর করা এক সমীক্ষায় দাবী করা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক শহর হলো পাকিস্তানের করাচি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের গ্যাংওয়ারের জন্য যেখানে বিখ্যাত। প্রতিনিয়ত খুনোখুনি ধর্ষণ লেগেই থাকে।
এই করাচি শহরে বাস করেন প্রায় ২০ লাখ বাংলাভাষী মানুষ, যারা বাঙালী। বাংলা ভাষায় কথা বলেন। বোয়াল মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে জর্দা পান মুখে দেন। তাঁদের কলোনির রাস্তায় হাঁটলে শুনতে পাবেন বাংলাদেশের মমতাজের হিট গান, ‘খায়রুল লো তোর লম্বা মাথার কেশ’ বা ‘ তুমি দিও নাগো বাসর ঘরের বাত্তি নিভাইয়া।‘ হ্যাঁ, পাকিস্তানের করাচির বাঙালিদের বাড়িতে বাড়িতে আজও চলে রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, মুমতাজ, অ্যান্ড্রু কিশোরের সঙ্গে কিশোর কুমার, আশা ভোঁসলের বাংলা গান।
(ছবি- ইন্টারনেট)।
করাচি ইউনিভার্সিটি থেকে বাংলায় মাস্টার্স করা যায়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়ানো হয় রবীন্দ্রনাথের গোরা, নজরুলের অগ্নিবীণা থেকে জসীমউদ্দীনের নকশী কাঁথার মাঠ। পড়ানো হয় হুমায়ুন আহমেদ, সুনীল, শক্তি, মাণিকও। একসময় কওমী-বন্ধন এবং মুক্তি নামে বাংলাভাষার দুটি দৈনিক সংবাদপত্রও প্রকাশিত হতো করাচি থেকে। তাই করাচিকে ‘মিনি বাংলাদেশ’ বলে থাকেন পাকিস্তানের মানুষ। করাচির মাচ্ছি কলোনি, বাঙালী কলোনি, বাংলাবাজার কলোনি, চিটাগাং কলোনি, মুসা কলোনি, ইব্রাহিম হায়দারির মতো প্রায় ১৩২টি বাঙালি কলোনি আছে আশপাশে। এসব কলোনিতেই বাঙালিদের বসবাস। তাদের আত্মীয়দা, বিয়ে শাদি সবই সারতে হয় নিজেদের মধ্যে এসব কলোনিতে। বাইরে বরোবার জো নেই। অন্য কোনো সস্প্রদায়ের সঙ্গেও তাদের মেলামেশা হয় না।

কী ভাবে বাঙালিরা করাচি গেলেন ঃ
করাচিতে বাঙালিরা প্রথম আসেন ব্রিটিশ আমলেই। মাছ ধরার কাজে বাঙালির পারদর্শিতার জন্য বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল থেকে জেলেদের নিয়ে যান করাচির উর্দুভাষী ব্যবসায়ীরা। বাংলাভাষী হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই ছিলেন সেই দলে। ব্যবসায়ীরা সমুদ্রের ধারে জেলেদের কলোনি গড়ে দেন। সময়টা ছিলো বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ। এই বাঙালী মৎসজীবীরা দ্রুত করাচির উর্দুভাষী বাসিন্দাদের সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেন।
দ্রুত শিখে নেন উর্দুভাষা, কিন্তু বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি ভোলেননি। পরবর্তীকালে, ভারত স্বাধীন হওয়ার পর পুর্ব-পাকিস্তান (বাংলাদেশ) থেকে প্রচুর সংখ্যায় বাঙালি করাচিতে আসেন।  তবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পাকিস্তান থেকে বেশ কিছু বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। কিন্তু বেশিরভাগই রয়ে যান করাচিতে।
(ছবি- ইন্টারনেট)।
বিভিন্ন সূত্রের মতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর খুলনা অঞ্চল থেকে প্রচুর সংখ্যক রাজাকার, স্বাধীনতা বিরোধী পালিয়ে এসে করাচিতে বসবাস শুরু করেছিলেন। ৮০ ও ৯০-এর দশকে জীবিকার সন্ধানে প্রচুর বাঙালি বাংলাদেশের নোয়াখালী ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে করাচিতে এসেছিলেন। কারণ ঐ সময় বাংলাদেশি টাকার তুলনায় পাকিস্তানি টাকার দাম ছিল প্রায় দ্বিগুণ। আয় রোজগারও ছিল ভালো।
১৯৯৫ সালে পাকিস্তানে বাংলাভাষীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২৫ লাখ। এর মধ্যে করাচিতেই প্রায় ২০ লাখ।
এরমধ্যে ভারত থেকে করাচিতে স্থায়ীভাবে চলে আসে প্রায় এক কোটি হিন্দি ও উর্দুভাষী মুসলিম। তা ছাড়াও করাচিতে ছিলেন ছয় থেকে সাত লাখ আফগানি, হাজার পাঁচেক ইরানি, কয়েক হাজার নেপালি, শ্রীলঙ্কান এবং ফিলিপিনো। এ ছাড়াও বার্মিজ বৌদ্ধদের অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে ৫ লাখ রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে করাচিতে এসে উঠেছিলেন। সুতরাং জীবিকার তাগিদে, অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে করাচিতে শুরু হয়ে গিয়েছিল জায়গা দখলের লড়াই।
কেমন আছেন করাচির বাঙালিরা?
ভালো নেই, করাচির বাঙালিরা। ১৯৭১ পাল্টে দেয় পাকিস্তানের ২৫ লাখ বাঙালির ললাটলিখন। পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালিরা গঠন করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ। কপাল পুড়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানে থাকা বাঙালির। সেই থেকে তাঁরা পাকিস্তানে ‘মীরজাফর’। পাকিস্তানি সমাজের সর্বস্তরে ঘৃণা, বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়ে কোনও মতে বেঁচে রয়েছেন পাকিস্তানকে আপন ভাবা এই মানুষগুলি ।
ভারত থেকে আগত উর্দুভাষী মোহাজির জনগোষ্ঠীর পরেই জনসংখ্যার দিক থেকে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল বাংলাভাষী ‘বাঙ্গালী’ জনগোষ্ঠী। করাচি ক্রমশ বেরিয়ে যেতে শুরু করেছিল ভূমিপুত্রদের হাত থেকে। তাই বেনজির ভুট্টো পাকিস্তানে ‘বাংলাদেশি হটাও‘ অভিযান শুরু করেন। বেনজির ভুট্টোর অতি সক্রিয়তার পিছনে আরেকটি কারণ খুঁজে পান সমালোচকেরা। সেটি হল ভোটাধিকার না থাকলেও, করাচির বাঙালিরা বেশিরভাগই পাকিস্তান মুসলিম লীগের সমর্থক। যেটি বেনজির ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান বিরোধী দল।
বেনজির ভুট্টো সরকার বেনজিরভাবেই পাকিস্তান থেকে বিমানে করে বেশকিছু বাঙালিকে পাঠিয়ে দেন বাংলাদেশে। যা নিয়ে বেনজির ভুট্টোর পাকিস্তানের সঙ্গে খালেদা জিয়ার বাংলাদেশের সম্পর্কের চুড়ান্ত অবনতি ঘটেছিল। খালেদা জিয়া, পাকিস্তানের পাঠিয়ে দেওয়া দুই বিমানভর্তি বাংলাভাষী শরণার্থীকে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। দুটি বিমানকেই পত্রপাঠ ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান মুসলিম লিগ ও ধর্মীয় সংস্থাগুলি বেনজির ভুট্টোর এই কাজকে ইসলামবিরোধী বলে আন্দোলনে নেমে পড়েছিল। ফলে বেনজির ভুট্টোকে ‘বাংলাদেশি হটাও‘ অভিযান পিছিয়ে আসতে হয়েছিল। ২০ লাখ বাঙালি রয়ে গিয়েছিলেন করাচিতেই।
(ছবি- ইন্টারনেট)।
বংশপরম্পরায় পাকিস্তানে থেকেও আজও পাকিস্তানের জাতীয় পরিচয়পত্র মেলে না বাংলাভাষীদের। নাগরিকত্ব দূরের কথা, আজও ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কাজ করতে হয়। তাও নিতে হয় ঘুরপথে, অনেক টাকা ঘুষ দিয়ে। করাচির মফস্বলে ‘পাকিস্তানি বেঙ্গলি অ্যাকশন কমিটি‘ নামে বাঙালিদের একটি সংগঠন সক্রিয়। তাঁদের কাছ থেকে জানা যায়, জাতীয় পরিচয়পত্র মেলেনা বলে পাকিস্তানের বাঙালিরা উচ্চশিক্ষা এবং সরকারি চাকরি পান না। জমি বাড়ি কিনতে পারেন না। বাড়ি ভাড়া করে থাকতে হয়।
বহুকাল আগে দেশ ছেড়েছেন, তবুও তৃতীয় প্রজন্মের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে পারেননি।
আজও করাচির বাঙালিদের বাস করতে হয় ঘিঞ্জি বস্তিতে চারদিকে নোংরা জল এবং আবর্জনার মধ্যে। যে বস্তিগুলিতে দিনের মধ্যে কুড়ি ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। পানীয় জল আসে দিনে মাত্র একবার। উচ্চশিক্ষা না থাকার ফলে নবীন প্রজন্মের বাঙালিরা ছোটখাটো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কেউ রাস্তার পাশে সবজি বেচেন, কেউ চায়ের দোকানে বা মুদি দোকানে কাজ করেন, কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান।
বেশির ভাগ বাঙালিই কলোনির বাইরে খুব একটা বের হন না। এলাকার বাইরে বের হলে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। ফলে কলোনির ভেতরেই ‘পাঠান’ আর আফগানিদের ছোটখাটো কারখানায় নামমাত্র পয়সায় দিনমজুরের কাজ করতে হয় অধিকাংশ বাঙালিকে। অথচ করাচির মৎস্যশিল্প দাঁড়িয়ে আছে বাঙালি শ্রমিকদের ওপর। পাকিস্তানি ব্যবসায়ীরা সস্তা শ্রমিক পান। তাই তাঁরা চান না বাঙালিরা পাকিস্তান ছেড়ে চলে যান। কিন্তু বাঙালিদের নাগরিকত্ব বা তাঁদের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়নের জন্য তাঁরা আদৌ চিন্তিত নন।
পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান আসাদ ইকবাল বাট একবার বিবিসিকে বলেছিলেন বাঙালিদের মর্মান্তিক অবস্থার কথা। তিনি বলেছিলেন “একজন অবাঙালি পাকিস্তানি শ্রমিক যেখানে মাসে ১২-১৩ হাজার রুপি মজুরি পান, একজন বাঙালি শ্রমিক পান তার অর্ধেক। বাঙালি মেয়েরা কারখানা এবং লোকের বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে শুধু যে পয়সা কম পান তা নয়, অনবরত যৌনশোষণের শিকারও হচ্ছেন তাঁরা।“
পাকিস্তানে বাঙালিদের জীবনযাত্রার মান একশো বছরেও উন্নত না হওয়ার বড় কারণ হলো, বাঙালিরা পাকিস্তানের নাগরিক নন। যেহেতু নাগরিক নন তাই তাঁদের ভোট নেই। যেহেতু ভোট নেই, পাকিস্তানের রাজনীতিকদের কাছে বাঙালিদের কোনও দাম নেই। সম্প্রতি অবশ্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, বাঙালিদের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্ট দেবেন। কিন্তু পাকিস্তানের বাঙালি আর রাজনৈতিক নেতাদের স্তোতিবাক্যে ভুলতে রাজি নন। তাই করাচির বেশিরভাগ বাঙালি নেমেছেন অধিকার আদায়ের আন্দোলনে।
অমানুষিক বৈষম্য ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে করাচির বেশ কিছু বাঙালি পরিবার বাংলাদেশে ফিরে যাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। ঠিক যেভাবে পাকিস্তানের হিন্দুরা চেষ্টা করছেন ভারতে ফেরার। প্রতিদিনই শয়ে শয়ে বাঙালি করাচির বাংলাদেশি কনস্যুলেটে গিয়ে বাংলাদেশের ভিসার জন্য আবেদন করছেন। তাঁরা হয়ত বুঝেছেন এক গাছের ছাল কখনও অন্য গাছে লাগানো যায়না। তাঁরা বুঝেছেন ‘ খাঁটি সোনার চাইতে খাঁটি আমার দেশের মাটি’। কিন্তু বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গেল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সবচেয়ে আলোচিত