ঢাকা   সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯   রাত ৯:৩৩ 

সর্বশেষ সংবাদ

এক্সিম ও ন্যাশনাল ব্যাংক মালিকদের বিরোধের নেপথ্যে নানা কাহিনীঃ ঋণ নিয়ে যথেচ্ছাচার,মানা হয় না বিধিবিধান

দেশের দুই বেসরকারি ব্যাংক এক্সিম ও ন্যাশনাল ব্যাংক মালিকদের ঋণ দেয়া-নেয়াকে কেন্দ্র করেই বিরোধ থানাপুলিশ পর্যায়ে গড়িয়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংক খাতের লোকজন। তবে এমন পরিস্থিতি দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনিসংকেত বলেও মনে করেন আর্থিক খাত বিশ্লেষকরা। দু’ব্যাংকের বিরোধ এখন কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে সেটাই দেখার বিষয়। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে আপোষে গিয়েই শেষ হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ এটা বেশিদূর এগুলো নিজেদের থলের বেড়ালই বের হয়ে যাবে।
উল্লেখ্য সিকদার গ্রুপের এমডি রিক হক সিকদার ও তার ভাই দিপু হক সিকদারের বিরুদ্ধে এক্সিম ব্যাংকের করা মামলায় বলা হয়েছে সিকদার গ্রুপের ৫০০ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর না করায় ব্যাংকটির এমডি ও ডিএমডিকে জিম্মি করে রাখেন ও হত্যার হুমকি দেন সিকদার গ্রুপের এমডি ও তার ভাই। তারা আবার ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালকও। এর জবাবে ন্যাশনাল ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সিকদার গ্রুপের পক্ষ থেকে এ ধরনের ঋণের কোনো আবেদনই করা হয় নি। সিকদার গ্রুপের এমডি ও তার ভাই এক্সিম ব্যাংকের এমডি-ডিএমডির সঙ্গে দেখা করতে গুলশান অফিসেও যান নি। মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে মামলা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
দু ব্যাংকের এমন পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, মামলায় বিব্রত দেশের ব্যাংকিং সেক্টর। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, মালিকদের ক্ষমতার বলি হন ব্যাংক কর্মকর্তারা। ব্যাংকের পরিচালকরা সাধারণ আমানতকারী ও সাধারণ ব্যাবসায়িদের স্বার্থের দিকে না তাকিয়ে নিজেরা যথেচ্ছভাবে ঋণ নিয়ে নেন। হুমকির মুখে ঠেলে দেন ব্যাংককে। দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি ব্যাংকেরই একই অবস্থা। পরিচালকরা জামানতবিহীন ঋণ নিয়ে ফতুর করে দিচ্ছেন ব্যাংককে।
আলোচিত এ ঘটনার বিরোধের উৎপত্তিও একই সূত্র থেকে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। এক্সিম ব্যাংকের মামলায় বলা হয়েছে, ন্যাশনাল ব্যাংকের দুই পরিচালক যে পরিমাণ ঋণ ( ৫০০ কোটি টাকা) চেয়েছেন তাদের বন্ধকী সম্পদের পরিমাণ তারচেয়ে অনেক কম হওয়ার রিপোর্ট দেয়ায় এমডি ডিএমডিকে জিম্মি করে হত্যার হুমকি দেয়া হয়।
অপর দিকে ন্যাশনাল ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এক্সিম ব্যাংকের কয়েকজন পরিচালক ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে উপযুক্ত জামানত ছাড়াই ঋণ নিয়েছেন। এমন কি মামলার বাদিও উপযুক্ত জামানত ছাড়া ঋণ নিয়েছেন।
দু ব্যাংকের পাল্টপাল্টি বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে ব্যাংক পরিচালকরা কোনো জামানত ছাড়াই কোটি কোটি টাকার ঋণ নিয়ে নেন। এসব ঋণ শেষ পর্যন্ত ফেরত আসে কী না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এ দিকে এক্সিম ব্যাংকের মামলায় পলাতক আছেন ন্যাশনাল ব্যাংকের দুই পরিচালক সিকদার গ্রুপের এমডি রন হক সিকদার ও তার ভাই দিপু হক। পুলিশ বলছে তাদের গ্রেফতারের জন্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে ঘটনার ১২ দিন পর মামলা,আর মামলা দায়েরের ১০ দিনেও কোনো আসামী গ্রেপ্তার না হওয়া রহস্যজনক বলে মনে করছেন অনেকেই।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগঃ
ন্যাশনাল ব্যাংকের দুই পরিচালক দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী সিকদার গ্রুপের এমডি রন হক সিকদার ও তার ভাই দিপু হক সিকদারের বিরুদ্ধে গত ১৯ মে গুলশান থানায় মামলা করেন এক্সিম ব্যাংকের পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল সিরাজুল ইসলাম। মামলার এজাহারে এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া ও অতিরিক্ত এমডি ফিরোজ হোসেনকে অপহরণ করে হত্যার হুমকি এবং গুলি করার অভিযোগ করা হয়। বলা হয় গুলি এমডি হায়দার আলীর কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। মামলায় বলা হয় সিকদার গ্রুপের ৫০০ কোটি টাকা ঋণ আবেদনের বিপরীতে বন্ধকী সম্পত্তির দাম কম হওয়ার কথা বলায় রন হক ও দিপু হক অস্ত্রের মুখে গত ৭ মে পূর্বাচল থেকে বনানীতে সিকদার গ্রুপের অফিসে হায়দার আলী ও ফিরোজকে তুলে নিয়ে যান। সেখানে তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। পরে জোর করে সাদা কাগজে সই নেয়া হয়। এজাহারে বলা হয়, দিপু সিকদারের নির্দেশে তাদের বাবা জয়নাল হক সিকদারের কাছে দুই কর্মকর্তাকে নিয়ে ফটোসেশান করানো হয়।
এক্সিম ব্যাংকের এমডি, ডিএমডি ও দুই ড্রাইভারকে প্রায় ৫ ঘন্টা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় ছেড়ে দেয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
ন্যাশনাল ব্যাংকের পাল্টা অভিযোগঃ দুই পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনায় গণমাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য পাঠিয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। ব্যাংকটির আইনী পরামর্শক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আব্দুল বাসেত মজুমদার লিখিত বক্তব্যে জানান, রন হক এক্সিম ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ পেতে কোনো আবেদনই করেন নি। তিনি এক্সিম ব্যাংকের গুলশান এভিনিউ শাখায় যাননি,এক্সিম ব্যাংকের এমডি ডিএমডির সঙ্গেও দেখা করেন নি। সেই ক্ষেত্রে ঋণ এবং এই সংক্রান্ত জামানত নিয়ে দরকষাকষির কোনো প্রশ্নই আসে না। ঘটনার ১২ দিন পর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলা দায়ের করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে।
বাসেত মজুমদার বলেন, গুলশান থানায় করা মামলার বাদী সিরাজুল ইসলাম নিজেও ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেছেন। এসব ঋণের উপযুক্ত জামানত ছাড়াই ঋণ নিয়েছেন। এক্সিম ব্যাংকের একজন পরিচালক গত ১৩ মে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ৫ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলেও জানানো হয়।
নেপথ্যে কী আছেঃ
এক্সিম ব্যাংকের মামলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে নেপথ্যে অনেক ঘটনা রয়েছে। ঘটনা ঘটেছে ৭ মে আর মামলা হয়েছে ১৯ মে। ব্যাংকের দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে আটক করে, হত্যার হুমকি দেয়া, গুলি করা, সাদা কাগজে সই নেয়ার মতো ঘটনা ঘটলেও তা ১২ দিন গোপন রাখা হলো কেনো? এটা প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধ না ব্যক্তি বিরোধ? এ ছাড়া মামলায় যারা ক্ষুব্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সেই এমডি ডিএমডির কেউ মামলা করলেন না। মামলা করলেন তৃতীয় একজন যিনি এক্সিম ব্যাংকের পরিচালক সিরাজুল ইসলাম। এটাও রহস্যজনক এবং নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
২০০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগঃ সিকদার গ্রুপের মালিকানাধীন একটি ইংরেজী পত্রিকা রয়েছে নাম বাংলাদেশ পোষ্ট। পত্রিকাটির প্রকাশক হলেন সিকদার গ্রুপের এমডি রিক হক সিকদার। পত্রিকাটির গত ১৩ মে সংখ্যায় এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও নাসা গ্রুপের মালিক নজরুল ইসলাম মজুমদারকে নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এতে বলা হয় নজরুল ইসলাম মজুমদার ২০০০ কোটি টাকা পাচার করেছেন। এ ছাড়া নাসা গ্রপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিধিবহির্ভূতভাবে ঋণ নিয়েছেন। তার অর্থিক নানা অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয় রিপোর্টে। এসব অনিয়ম কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদন্ত করছে বলেও জানানো হয়। উল্লেখ্য নজরুল ইসলাম মজুমদার ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংক ( বিএবি) এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সুষ্ঠু তদন্ত চান ব্যাংকাররাঃ ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা এ ঘটনার সুষ্টু তদন্ত দাবি করে বলেছেন, ব্যাংকিং খাত এমনিতেই খারাপ অবস্থায়। এর মধ্যে ঋণ নিয়ে যদি পরিচালকরা বিরোধে জড়ান তা হলে সাধারণ গ্রাহকরা আরো দুশ্চিন্তায় পড়বে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, দু’ব্যাংকের পরিচালকদের এ ঘটনার দিকে নজর রাখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সবচেয়ে আলোচিত