ঢাকা   বুধবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮   রাত ১২:০৩ 

সর্বশেষ সংবাদ

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: তদন্ত কমিশন গঠনে বাধা কোথায়?

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার ৪৬ বছর পর কন্যা শেখ হাসিনার এ বক্তব্যই প্রমাণ করে- বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনের সামরিক শক্তিকে কিঞ্চিৎ চিহ্নিত করা সম্ভব হলেও, রাজনৈতিক শক্তি এবং কুশীলবদের চিহ্নিত করা আজও উদ্ঘাটন করা যায়নি। শুধু তাই নয়, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সাবেক সেনা সদস্যদের বিচার হলেও পেছনের ষড়যন্ত্র উদঘাটনে সার্বিক ও সঠিক তদন্ত পর্যন্ত হয়নি।
মামলা কিংবা জিডি- কোনওটাই দায়ের করতে দেয়নি তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা। পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই বছরের অক্টোবরে বঙ্গবন্ধুর পিএ আ ফ ম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এ কথা সর্বজনবিদিত যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড বহুমাত্রিকতায় ভরপুর। এখানে যেমন দেশীয় সামরিক ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছিল, তেমনি ছিল আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর গভীর ও পরিকল্পিত চক্রান্ত। তৃতীয় বিশ্বের সরকারপ্রধান হলেও বঙ্গবন্ধু শুধু জাতীয় রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি ‘ক্যারিশমাটিক লিডার’। তার মাঝে ছিল বৈশ্বিক নেতৃত্বের আদ্যোপান্ত গুণাবলী। স্বভাবতই তার হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্র সোনার বাংলার বাইরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিস্তৃত হবে- তা সহজেই অনুমেয়।
মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এই অভ্যুত্থান পরিকল্পনার সবটাই জানতেন। তিনি উৎসাহ দিয়েছেন; অভিযুক্ত সেনা সদস্যদের আশ্রয়-প্রশ্রয় তো দিয়েছেনই। আবার কোনদিন যেন হত্যাকারীদের আইনের সম্মুখীন হতে না হয়, সে ব্যবস্থাও তিনি করেছিলেন। তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে কিছু সেনা সদস্যের ব্যক্তিগত ক্ষোভ, বঙ্গবন্ধু ও তার দলের ওপর অনাস্থা এবং সমকালীন রাজনীতিকে দায়ী করলেও প্রকৃত কারণ আসলেই কী, কুশীলবরাই বা কারা তা নিয়ে এখন তদন্ত কমিশন গঠনের সময় এসেছে।
বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার হত্যার ঘটনায় প্রথম অনুসন্ধান কমিশন গঠিত হয় ১৯৮০ সালে, যুক্তরাজ্যে। আইন করে বিচারের পথরুদ্ধ করে দেয়ায় শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী ও আয়ারল্যান্ড সরকারের সাবেক মন্ত্রী শন ম্যাকব্রাইড, ব্রিটিশ এমপি ও আইনবিদ জেফরি টমাস এবং ব্রিটিশ আইনবিদ, মানবাধিকারকর্মী ও পরিবেশবাদী আইনবিদ অবরি রোজসহ চার জন মিলে এ কমিশন গঠন করেছিলেন। যদিও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার অনুসন্ধানের কাজে ওই কমিশনকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়া তো দূরের কথা, ভিসা পর্যন্ত দেয়নি। পরবর্তীতে (১৯৮২ সালের নভেম্বর) ওই অনুসন্ধান কমিশনের অধীনেই ‘শেখ মুজিব মার্ডার ইনকোয়ারি: প্রিলিমিনারি রিপোর্ট অব দ্য কমিশন অব ইনকোয়ারি’ শিরোনামে একটি বই লন্ডনের র‍্যাডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়; যার মুখবন্ধ লিখেছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের সরকার একজন হত্যাকারীকেও বিচারের মুখোমুখি করেনি। বস্তুত এসব হত্যাকারী এবং তাদের সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীরা সরকারের কাছ থেকে সুরক্ষা এবং সহযোগিতা পেয়ে এসেছে। এদের কাউকে কাউকে বিদেশে কূটনৈতিক মিশনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অন্যরা দেশেই নানা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। এভাবে অপরাধীকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।’
সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি হিসেবে জেনারেল জিয়া এ অভুত্থানের খলনায়ক ছিলেন; যা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কারণ, প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে কর্নেল ফারুক ও রশীদ স্পষ্টতই বলেছিল, পঁচাত্তরের ঘটনায় জিয়াউর রহমান জড়িত। কর্নেল ফারুকের ভাষ্য ছিল, তারা জিয়াউর রহমানকে পঁচাত্তরের মার্চ মাসে তাদের এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। প্রখ্যাত সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজকেও কর্নেল ফারুক ও রশীদ স্পষ্টতই বলেছিল, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিষয়টি নিয়ে তারা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বহুবার গোপনে মিলিত হয়েছে এবং পরিকল্পনার বিষয়টি অবহিত করেছিল। ১৯৭৬ সালে লন্ডনের প্রখ্যাত সাংবাদিকরা জিয়াউর রহমানকে অভিযুক্ত করার প্রশ্নে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি নীরবে বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং চুপ থাকেন। যা আইনের চোখে প্রকারান্তরে স্বীকৃতিরই নামান্তর। জিয়াউর রহমান যে খুনীদের উৎসাহিত করেছিলেন, সেটা তো ১৯৭৬ সালের ২ অগাস্ট লন্ডনের এক টেলিভিশন টক শো-তে ফারুক-রশীদ অকপটেই প্রকাশ করেছিল। জিয়াউর রহমানের অতি আপনজন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদও তার লিখিত পুস্তক ‘ডেমোক্রেসি অ্যান্ড চালেঞ্জ অব ডেভেলপমেন্ট’- এ পরিষ্কার করেই লিখেছেন, জাতির জনকের হত্যায় জিয়ার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।

১৯৭৬ সালের ৩০ মে লন্ডনের বহুল প্রচলিত দৈনিক সানডে টাইমসে এক পূর্ণ পৃষ্ঠা লিখনীর মাধ্যমে খুনি কর্নেল ফারুক জাতির পিতা হত্যায় জিয়ার ভূমিকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। আর খুনিদের বিচারের হাত থেকে রক্ষায় প্রথমে মোশতাক ও পরে জিয়াউর রহমানের ইনডেমনিটি অর্ডিনেন্স জারি করেন এবং পরে (১৯৭৯ সাল) তা আইনে প্রণীত করেন। এভাবেই তারা খুনিদের রক্ষা করেছে। দণ্ডবিধি ১১৮, ১১৯, ১২০, ১২০-এর ক ও খ এবং ১২৪ ধারায় জিয়াউর রহমান অপরাধ সংগঠিত করেছিলেন। খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া দণ্ডবিধি ২১২ ধারার অপরাধ। আর অন্যান্য ধারাসমূহে অভিযুক্ত হওয়ার অর্থ হলো- একই অপরাধ সংগঠনের উদ্দেশ্যে সম্মত, সহযোগিতা করা ও সকল বিষয় গোপনে রাখা। এ ধরনের ধারবাহিক অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্বেও জিয়াকে অযথাই তার দল রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট মোহাম্মদ নাসিম আমাকে ঢাকা থেকে ফোন করে খবরটি দেন; বিষয়টি শুনে মু‍হূর্তের মধ্যে আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়ি এবং বকুল, বেবি ইসলাম, ফজলুল হক মন্টুসহ অনেকের সঙ্গে প্রতিরোধের বিষয়ে আলোচনা শুরু করি। এ সময় তৎকালীন পাবনার রক্ষীবাহিনীর নেতা আলমগীরকে ফোন করলে তিনি জানান, তার সৈনিকরা ব্যাটেল ড্রেসে প্রস্তুত আছেন এবং তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ৪৫টি এলএমজিসহ যথেষ্ট সমরাস্ত্র তাদের কাছে রয়েছে। তিনি এ-ও বলেন, “এখনি হাইকমান্ড থেকে জানলাম, গুটিকয়েক বিভ্রান্ত সৈনিক এই খুনীর মহোৎসবে জড়িত। আমরা জেলার রক্ষীবাহিনী ও আপনারা রুখে দাঁড়ালে মুহূর্তেই এদেরকে নিবৃত করা সম্ভব। কেননা সমগ্র সেনাবাহিনী এ বিষয়ে জড়িত বা অবগত নয়।” আমরা প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সকাল ৮টায় জেলা স্কুলের মাঠের সামনে জড়ো হই; ঠিক এ সময় পাবনার তৎকালীন এসপি পিবি মিত্র ক্রন্দনরত অবস্থায় হাজির হয়ে জানান, পুলিশ ওয়্যারলেসে এই মাত্র তিনি খবর পেয়েছেন, সকল বাহিনীর প্রধানরা খুনি মোশতাকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে রেডিও সেন্টারে উপস্থিত হয়েছেন। কাজেই এ মুহূর্তে উচিত নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করা। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে আমরা আত্মগোপনে চলে যাই এবং পরবর্তীতে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর খুনি মোশতাকের সামরিক বাহিনী দ্বারা গ্রেপ্তার হই। অতঃপর প্রথমে পাবনা জেলে ও পরে রংপুর জেলে নিয়ে আমার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। সাল তখন ১৯৭৬। রংপুর কারাগারে থাকাকালীন হঠাৎ একদিন ৭-৮ জন এয়ারফোর্স অফিসার গ্রেপ্তার হয়ে আসেন। ঢাকায় জাপানি বিমান হাইজ্যাক হওয়ার ঘটনাকে ক্যু আখ্যা দিয়ে এয়ারফোর্সেরই প্রায় ৮০০-৯০০ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে তাদের মুখে শুনেছি; যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক ছিলেন। সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীর অনেক মুক্তিযোদ্ধা অফিসারও তখন গ্রেপ্তার হয়েছিল। এ এয়ারফোর্সের কর্মকর্তারা আলাপ-আলোচনাকালে বললেন, তারা কখনও কোনরকমভাবে ওই ঘটনার (বিমান হাইজ্যাক) সঙ্গে জড়িত নয়। এমনকি তারা তখনও জানেন না, তাদের আটকের কারণ কী! আমরা সকল রাজবন্দিসহ ওই কর্মকর্তারা জেলের ভেতরে একই চত্বরে থাকতাম।

একদিন সকালে নাস্তার পূর্ব মুহূর্তে খেয়াল করলাম, আটক বিমানবাহিনীর ৩ জন কর্মকর্তা অনুপস্থিত। মনে প্রশ্ন জাগলেও তৎসময়ের আতঙ্কজনক অবস্থার প্রেক্ষিতে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। প্রিজন কর্মকর্তাকেও বেশ বিষণ্ণ দেখা গেল। পরদিন সকালে বাকি তিনজনকেও দেখলাম না। প্রাথকিভাবে ধারণা হয়েছিল, হয়তো বা তারা নির্দোষ ছিল, তাই রাতে ছাড়া পেয়ে গেছে।
আমার জেলা পাবনার একজন সিপাহী, যাকে সিআইডি করিম বলে ডাকা হত; তার কাজ ছিল জেলের ভেতরের গোপন খবর সংগ্রহ করা। আমার সাথে তার সখ্যতার কারণেই কৌতুহল নিয়ে সাহস করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এয়ারফোর্সের ওই কর্মকর্তারা কি মুক্তি পেয়েছে? তাদের দেখছি না।” এ কথা বলার পর হঠাৎই সে অশ্রুসজল চোখে আমাকে বলল, “বিষয়টি গোপন রাখবেন, তাদের ছয়জনকেই দুই রাতে ফাঁসিয়ে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ফাঁসিতে ঝোলার পূর্বে তারা চিৎকার করে বলেছে, ‘আমরা নির্দোষ, আমাদের অপরাধ কী, জানিনা। কেননা আমাদের কোনো কোর্ট মার্শালও হয়নি’।”
পরে শুনেছিলাম, বাংলাদেশের সকল কারাগারে আটক সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী সাত-আটশ’ কর্মকর্তাকে এভাবেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে জিয়াউর রহমান হত্যা করেছে। এ অবস্থায় জিয়াকে কি ঠাণ্ডা মাথার একজন নৃশংস খুনি বলা যায় না? পরবর্তীতে বিষয়টি দেশে-বিদেশের সকলেই জানতে পেরেছিল। অন্যায়ভাবে এমন শত শত সেনা কর্মকর্তাকে খুন করার একটাই কারণ ছিল, আর তা হলো- গদি রক্ষা। মুক্তিযোদ্ধা ও সেনা কর্মকর্তা হত্যা, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে ক্ষমতায় বসানো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ সংবিধানকে তছনছ করে সাম্প্রদায়িক দেশ বানানো এবং স্বাধীনতার মাধ্যমে অর্জিত সকল মূলবোধকে ধূলিস্যাতের খলনায়ক কি তাকে বলা না?
শেখ হাসিনা সঠিকই বলেছেন, শেরে বাংলা নগরে থাকা কবরটি জিয়ার নয়। আমরাও লক্ষ্য করেছি, যারা সেই কবরে মাঝে মাঝে বিলাপের উদ্দেশে গিয়ে হাসাহাসি করেন, তাদের মাঝে শোকের কোনো মুখচ্ছবি দেখা যায় না। মাঝে মাঝে নিজেরাও কলহে লিপ্ত হন। বঙ্গবন্ধু খুনসহ উপরোক্ত সকল প্রেক্ষাপট যদি বিবেচনা করা হয়, তবে এক বাক্যে এটাই বলা যায় যে, বিশ্বাসঘাতক এ খুনি জিয়ার জন্য কোন সমাধি তো নয়-ই, বরং অপরাধের শাস্তি হিসেবে ঘৃণাস্তম্ভ করার বিষয়টি এখন জাতি প্রত্যাশা করে। খেতাব প্রত্যাহারের দ্বিধাদ্বন্দ্বে আমার যেন কেন মনে হয়, কৌশলী অবস্থান কখনই এদের হাত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষা করা যাবে না। কারণ, তারা এখন প্রতিবিপ্লবের ভূমিকায় রয়েছে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ দাবি করে যে, যে কর্নেল তাহের জিয়াকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছিল; তাকেই ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছে জিয়াউর রহমান। কর্নেল তাহের ও জিয়ার মধ্যে ১৫ অগাস্ট ও ২ নভেম্বর নিয়ে কী সমঝোতা হয়েছিল, কর্নেল তাহের জীবিত থাকলে তা কি ফাঁস হয়ে যেত? এ কারণেই কি তাহের হত্যাকাণ্ড? এসব প্রশ্ন মানুষের মনে ঘুরপাক খায়। অনেকে এই পরিষ্কার ধারণাও করেন যে, বঙ্গবন্ধু হতাকাণ্ডের ব্যাপারে এদের মধ্যে অশুভ আঁতাত ছিল।
বঙ্গবন্ধুর খুনিদের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পুরস্কৃত করার বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয়। এ পুরস্কারের মধ্যে ছিল কে.এম মহিউদ্দিন আহমেদকে আলজেরিয়ায় দ্বিতীয় সচিব, লে. কর্নেল শরীফুল হক ডালিমকে চীনে প্রথম সচিব, আজিজ পাশাকে আর্জেন্টিনার প্রথম সচিব, মেজর বজলুল হুদাকে পাকিস্তানে দ্বিতীয় সচিব, মেজর শাহরিয়ার রশীদকে ইন্দোনেশিয়ায়, মেজর রাশেদ চৌধুরীকে সৌদি আরবে, মেজর নূর চৌধুরীকে ইরানে, মেজর শরিফুল হোসেনকে কুয়েতে, কিসমত হাসেমকে আবুধাবি, লে. খায়রুজ্জামানকে মিশর, লে. নাজমুল হোসেনকে কানাডা এবং লে. আব্দুল মাজেদকে সেনেগালে নিয়োগ করা। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড পরবর্তী সময়ে সরাসরি জড়িত সামরিক অফিসারদের বৈদেশিক দূতাবাসে সচিব পর্যায়ে চাকরি দেওয়ার এ বিষয়টি হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের জড়িত হওয়ার বিষয়টি আরও সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করে দেয়।
মেজর রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও একজন প্রত্যক্ষদর্শী সামরিক কর্মকর্তার দাবি, মুজিব হত্যার পর উল্লাসিত হয়ে জিয়াউর রহমান মেজর ডালিমকে বলেন, “তুমি একটা দারুণ অসাধারণ কাজ করেছো। আমাকে চুমু খাও। আমাকে চুমু খাও।” তারপর জিয়া গভীর আবেগে ডালিমকে জড়িয়ে ধরেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক লরেন্স লিফশুজের বলেছিলেন, জিয়া মুজিব হত্যার নেপথ্যচারী ‘প্রধান ছায়ামানব’ (The key shadow man)। তার মতে, “(প্রাপ্ত) তথ্যপ্রমাণ উল্লেখযোগ্য হারে এ ব্যাপারে ইঙ্গিত করে যে, জিয়া ছিলেন এই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান নকশাকার এবং তিনি খন্দকার মোশতাক আহমেদের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা পালন করেছিলেন।’’
বাহাত্তর-পরবর্তী বামপন্থি শক্তির উত্থানও শেখ মুজিব হত্যার অন্যতম পটভূমি সৃষ্টি করেছিল। এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বুলি আওড়িয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর আওয়ামী লীগ বিরোধী কার্যকলাপ এক্ষেত্রে ন্যাক্কারজনক ভূমিকা পালন করে। স্বাধীনতার কয়েক মাসের মধ্যে জাসদ গঠন এবং বিপ্লবের নামে সিরাজ সিকদারের উত্থানও পটভূমি সৃষ্টির সহায়ক। বলা হয়ে থাকে, ১৯৭২ সালে সংবিধানে সংযোজিত অবাধ গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকারকে অবাধ অপকর্মের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছিল অপশক্তি। গোপনে গঠন করেছিল সশস্ত্র দল ও স্কোয়াড বাহিনী। খুন-হত্যা, রাহাজানি, ডাকাতি জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল তারা। জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সহ-সভাপতি মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন এক সাংবাদিক সম্মেলনে ৪৭ টি থানা লুটের ঘটনা ও মুজিব হত্যায় নিজেদের দায় স্বীকার করেন। (ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডকুমেন্টস: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড; অধ্যাপক আবু সাইয়িদ)
সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত সেনাবাহিনীতে কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সংগঠন গড়ে তোলার উদ্দেশ্য বা কী ছিল? সে বিষয়টিও উদ্ঘাটন হওয়া উচিত। সবমিলিয়ে কর্নেল আবু তাহের নেতৃত্বে জাসদের সশস্ত্র শাখা আওয়ামী লীগবিরোধী অভ্যুত্থানে লিপ্ত হয় বলে ধারণা পাওয়া যায়। এখনও প্রশ্ন জাগে, জাসদ কেন এবং কী উদ্দেশ্যে তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার শ্রী সমর সেনকে অপহরণ করেছিল? পরবর্তীতে এভাবেই দেশের আইন শৃঙ্খলায় ভাঙন ধরানো এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পথ সুগম করা হয়। এর বাইরেও পাকিস্তানপন্থি হিসেবে মুসলিম লীগ, ভারতবিরোধী হিসেবে চীনাপন্থি বাম দলগুলো এবং স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারে ভাঙন ধরিয়ে খুনি মোশতাক যে পাকিস্তানের সঙ্গে আপসের প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছিলেন- সেটা তো সকলের জানা। ষড়যন্ত্রের বীজ তো সেখানেই বপিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় মোশতাকের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে কে এম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, আমলা মাহবুবুল আলম চাষীসহ অনেকের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমান ও খুনি মোশতাককে রক্ষার যে প্রত্যক্ষ চেষ্টা জেনারেল ওসমানী ও বিডিআর প্রধান খলিলুর রহমান করেছিলেন; তা আজ দেশবাসীর অজানা নয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কুশীলবদের চিহ্নিত করার প্রশ্নে তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়টি সরকারি নীতি-নির্ধারণী মহল থেকে বছরের পর বছর ঘোষণা করা হলেও তা এখনও বাস্তব রূপ পায়নি। দীর্ঘ ছেচল্লিশ বছর পরও হয়নি এই কমিশন। অথচ ইতিহাসের কলঙ্কিত ওই হত্যাযজ্ঞের নেপথ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে কারা, কীভাবে জড়িত ছিলেন- এই মর্মে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি বারবার উঠেছে। অনেকে নীতিনির্ধারণী নেতারাও ইতোপূর্বে কমিশন গঠনে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তবে তা এখন রূপ পায়নি। ২০২০ সালের অগাস্ট মাসে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের খলনায়কদের খুঁজে বের করতে তদন্ত কমিশন গঠনে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানান। ওই সময় তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সাবেক সেনা সদস্যদের বিচার হলেও এর পেছনের রাজনীতি এবং ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে তদন্ত হয়নি। মূলত সেটা খুঁজতেই তদন্ত কমিশন হবে। বিবিসি-কে দেওয়া আইনমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরেও তদন্ত কমিশনটির উদ্যোগে মাত্র একবার প্রাথমিক আলোচনার সুযোগ পেয়েছে। সবশেষ অগাস্টে দেওয়া আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের বক্তব্য অনুযায়ী, এই কমিশনের রূপরেখা ও কার্যাবলি কী হবে এবং কাদের দ্বারা এই কমিশন গঠিত হবে- এখনও পর্যন্ত সেসব বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে।
কমিশন গঠনে আইনগত ভিত্তি হলো The Commission of inquiry Act, 1956 (Act No VI of 1956). একদল সেনা কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিলেও এর পেছনে যে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছিল- তা তো বারবারই স্পষ্ট হয়েছে। তাহলে এটি গঠনে বাধা কোথায়? জাতির পিতার হত্যার বিচার পেতে কেন আমাদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল? যারা এটা রুখতে চেয়েছিলেন, তাদেরই বা উদ্দেশ্য কী ছিল? তারা কাদেরকে রক্ষা করতে চান?

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ঘটনার আদ্যোপান্ত জানেন- এখনও এমন অনেকে জীবিত আছেন। তথ্য প্রাপ্তির জন্য ‘Secret Documents of Intelligence Branch on Father of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman’, মিজানুর রহমান খানের ‘মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকাণ্ড’, আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘ইতিহাসের রক্তপলাশ পনেরোই আগস্ট পঁচাত্তর’, এ এল খতিবের ‘হু কিল্‌ড মুজিব’, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ-এর ‘ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডকুমেন্টস বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড’, জাহিদ নেওয়াজ খান-এর ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রামাণ্য দলিল’, জগলুল আলম-এর ‘মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের গোপন দলিল: বাংলাদেশ-ভারত–পাকিস্তান’, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম. সাখাওয়াত হোসেন-এর ‘বাংলাদেশ: রক্তাক্ত অধ্যায় ১৯৭৫-৮১’, মে. জে মুহাম্মদ খলিলুর রহমান-এর কাছে থেকে দেখা (১৯৭৩-১৯৭৫)’, লে কর্ণেল (অব:) এম এ হামিদ পিএসসি-এর ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’, মহিউদ্দিন আহমদ-এর ‘৩২ নম্বর পাশের বাড়ি: ২৫ মার্চ ১৫ আগস্ট’, অ্যাডভোকেট সাহিদা বেগমের ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা’, মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি-এর ‘পঁচাত্তরের রক্তক্ষরণ’ ছাড়াও অগণিত বইয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট রচনাসহ আগে-পরের ঘটনাগুলো সন্নিবেশিত আছে। সরকারের গোয়েন্দা বাহিনীকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি এসব গ্রন্থ ঘাঁটলেই হত্যায় রাজনৈতিক দিকসহ নানা প্রেক্ষাপট সবার সামনে ফুটে উঠবে। মুক্তিযুদ্ধের একজন গবেষক জনাব মাহমুদুল হাসানের গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ ১৯৭৯ সালে লিখিত ‘Bangladesh, the Unfinished Revolution’ গ্রন্থে বলেছেন, “অতি তুচ্ছ আওয়ামী লীগ নেতা কর্তৃক একজন সামরিক কর্মকর্তার স্ত্রী লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়নি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ দীর্ঘদিন আগেই নানা মাধ্যমে হত্যাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিল।”
প্রায় একই বক্তব্য দিয়েছেন অপর মার্কিন নাগরিক ও ঐতিহাসিক অধ্যাপক স্ট্যানলি ওলপার্ট ১৯৯৩ সালে তার লিখিত ‘Zulfi Bhutto of Pakistan: His Life and Times’ বইয়ে বলেন, “মুজিব হত্যাকাণ্ড বামপন্থি কমরেড আব্দুল হকের পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন।”
এদিন ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি; তার সঙ্গে তারা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকেও হত্যা করতে চেয়েছিল। স্বভাবতই মাত্র ৬ জন সামরিক কর্মকর্তার ফাঁসি কার্যকর বিচারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। এ ষড়যন্ত্রে কারা মদদ দিয়েছে, কারাই-বা হত্যার প্রেক্ষাপট রচনা করেছে; কারা দেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কেনই-বা মাত্র কয়েকজন বাদে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার প্রায় সকল সদস্য মোশতাকের মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়েছিলেন, দায়িত্ববান হওয়া সত্বেও দায়িত্ব পালন না করে প্রকারান্তরে খুনিদের সহযোগিতা করেছে- এই সবকিছুরই বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে। অতি বিলম্বিত হলেও এই মুহূর্তে কমিশন এখন ‘অতি জরুরী’ বলে দেশবাসী মনে করে। তা না হলে জাতি হিসেবে আমরা সম্পূর্ণভাবে দায়মুক্ত হতে পারব না। আমরা চাই, এ বছরই তদন্ত কমিশন গঠন হোক ও টার্মস অব রেফারেন্স অনুযায়ী কাজ শুরু করুক- এটাই জাতির প্রত্যাশা।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

nine − 1 =

সবচেয়ে আলোচিত