পাকিস্তানে নিরাপত্তাহীনতায় চীনা বিনিয়োগ; একে ৪৭ রাইফেলের ছবি ভাইরাল, নিরাপত্তা রক্ষায় চীনের ব্যয় বাড়ছে

0
197

পাকিস্তানে এক বাস বিস্ফোরণে নয়জন চীনা কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় দেশটিতে চীনের প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যবসায়িক বিনিয়োগের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মীদের নিরাপত্তা রক্ষায় চীনকে ব্যয় করতে হবে বলে বলা হচ্ছে।
জানা গেছে , বাসটি পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের দাসু জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে চীনা প্রকৌশলীদের নিয়ে যাওয়ার পথে বিস্ফোরিত হয়। এসময় ১৩জন ব্যাক্তি নিহত হন। তাৎক্ষণিকভাবে এ দুর্ঘটনার কারণ জানাতে পাকিস্তান ও চীনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিটি ছিলো পরস্পরবিরোধি।
ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে বলা হয় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গ্যাস লিক হয়ে এ বিস্ফোরণ হয়। অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয় দাবি করে এটি ‘বোমা হামলা’ এবং বিষয়টি নিয়ে তারা ‘দুঃখ ও নিন্দা’ প্রকাশ করে। তারা পাকিস্তানের কাছে কঠোর শাস্তি দাবি করেছে। ঘটনাটি নিয়ে দুপক্ষের এই অসামঞ্জস্য বিবৃতি নিয়ে গণমাধ্যমগুলোয় ক্ষোভে ফেটে পড়ে চীনা নাগরিকরা। পাকিস্তান সত্য গোপন করছে বলে অনেকে অভিযোগ করে।

এদিকে পাকিস্তানের মাটিতে চীনা কর্মীদের কাধে এ কে ৪৭ রাইফেল নিয়ে কাজ করার একটি ছবি নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। ইন্ডিয়া টুডেতে প্রকাশিত দেখা যাচ্ছে হাতে একে ৪৭ রাইফেল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাকিস্তানে কর্মরত চিনারা। মনে করা হচ্ছে আত্মরক্ষার স্বার্থেই তারা এই কাজ করছে। পাকিস্তানের সিপিইসি প্রজেক্টে কাজ করছেন বহু চিনের নাগরিক।
এদিকে বাসে বোমা হামলার প্রাথমিক অনুসন্ধানে ‘বিস্ফোরকের চিহ্ন’ পাওয়ার পর পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী টুইটারে বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদের বিষয়টিকে উড়িয়ে দেয়া যায় না।’ পরবর্তী পর্যায়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে ফোনালাপে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং এই বিস্ফোরণকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে উল্লেখ করেন।
চীনের জননিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ঝাও কেঝি জানিয়েছেন ঘটনাটি তদন্তে সহায়তা করতে পাকিস্তানে গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের একটি দল পাঠিয়েছে তারা। কিন্তু এ পদক্ষেপই কি যথেষ্ট?
বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক পদচারণা যেমন বাড়ছে তেমনি নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে তাদের করনীয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা আরএএনডি করপোরেশনের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ি, বিভিন্ন দেশে চীনের ৩০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া প্রতিবছর ১০ কোটির বেশি চীনা নাগরিক অন্যদেশে ভ্রমন করছে। এইসব নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষার জন্য চীন কি কোনদিন নিজেদের সামরিক সম্পদ মোতায়েনে বাধ্য হবে?

বিগত কয়েকবছর ধরে বিদেশে চীনা নাগরিকদের ওপর ভয়াবহ হামলাগুলোর অন্যতম এই বাস বিস্ফোরণ। একদিকে দেশের অভ্যন্তরে জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং দেশের বাইরে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মুহুর্তে বেইজিংকে এখন দেখাতে হবে তারা নিজেদের নাগরিকদের রক্ষার বিষয়টিতে কতোটা গুরুত্ব দিচ্ছে।
এছাড়া পাকিস্তানের বাস বিস্ফোরণের ঘটনাটি মধ্য এশিয়ায় চীনের প্রকল্পগুলো কতোটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে তা বুঝিয়ে দিচ্ছে। দেখা গিয়েছে বিগত বছরগুলোয় বেইজিংয়ের উচ্চাবিলাসি বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প এবং অবকাঠামো স্কিমের একাধিক প্রকল্পে বোমা হামলা হয়েছে।
এরমধ্যে সবচেয়ে বড় হুমকিতে রয়েছে চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর (সিপিইসি)। এই ৬০ বিলিয়ন ডলারের বেল্ট অ্যান্ড রোড ফ্লাগশিপ প্রকল্পটি চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং অঞ্চলের সঙ্গে আরব সাগরে পাকিস্তানের কৌশলগত গাদোয়ার বন্দরকে সড়ক,রেলপথ,পাইপলাইন ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বিশাল প্রকল্পের মাধ্যমে সংযুক্ত করবে। অবশ্য দাসু জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সিপিইসির আওতায় জ্বালানী প্রকল্পগুলোয় অন্তর্ভূক্ত নয়। তবে পাকিস্তানের দূর্ঘটনাটি সিপিইসি প্রকল্পে কর্মরত হাজার হাজার চীনা শ্রমিকদের আতঙ্কের মধ্যে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে চীনের তহবিলে পরিচালিত প্রকল্পগুলো ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এসব উন্নয়ন কর্মসূচিতে তারা খুব বেশি উপকৃত হচ্ছে না বলে দাবি করছে। বিশেষ করে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে চীন বিরোধি মনোভাব ক্রমে ঘনীভূত হচ্ছে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে করাচিতে চীনা কনস্যুলেটে হামলার দায় স্বীকার করে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। এর ছয় মাস পরেই গাদোয়ারে একটি বিলাসবহুল হোটেলে হামলা করা হয়। এই হোটেলটি গাদোয়ার বন্দরে কর্মরত চীনা কর্মীরা ব্যবহার করতেন।
প্রতিবেশি আফগানিস্তানে সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য পাকিস্তান নিজেদের জড়িত করার কারণে আসন্ন মাসগুলোয় দেশটিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে সামনে রেখে আফগানিস্তানের একটি বড় অংশ তালেবানরা এরইমধ্যে দখল করে নিচ্ছে।
বিভিন্ন প্রকল্প ও সেখানে কর্মরত চীনা নাগরিকদের এখন পর্যন্ত নিরাপত্তার জন্য বেইজিং মূলত পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল। তবে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ করা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো সুরক্ষার জন্য ক্রমে চীনভিত্তিক বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানির দিকে ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারে ৪৯ টি বিদেশি বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২৯টিই চীনভিত্তিক। ২০১৯ এবং ২০২০ সালে এই কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে। এসময়টিতে বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের কাজও এগিয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

eight − 8 =