ঢাকা   রবিবার, ২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯   সন্ধ্যা ৬:২৬ 

সর্বশেষ সংবাদ

স্বপ্ন পূরণের সারথি ডিজিটাল সেন্টার

বাল্যকাল থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেন রংপুরের সদর উপজেলার সদ্যপুস্করিনী ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামের আকতারুল ইসলামের ছেলে আরিফুজ্জামান মুন (৩০)। আজ তিনিই একজন সফল আইসিটি উদ্যোক্তা।
২০১০ সালে সরকারের ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে আবেদন করেন তিনি। সেখানে কাজ শুরুর পর থেকে অদ্যাবধি সাধারণ মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এই সেন্টার থেকে এ পর্যন্ত মোট ৪০০ জন শিক্ষিত যুবক ও যুব মহিলা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তাঁরা বর্তমানে আয়মূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িত রয়েছেন। এখন তিনি আউটসোর্সিং ও অন্যান্য ডিজিটাল কার্যক্রমের ওপর মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে কাজ করে মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত আয় করছেন। পাশাপাশি ২০১২ সালে তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে রসায়নে সম্মান ডিগ্রি লাভ করেন।

কেশবপুর গ্রামের মনোয়ারা বেগম জানান, তার হারানো জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এ সেন্টার থেকে খুব সহজেই সংগ্রহ করতে পেরেছেন। পালিচড়া গ্রামের আফরোজা বেগম সাত দিনের মধ্যেই এখানকার সেবার মাধ্যমে তাঁর জমির পর্চা পেয়েছেন।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে আরিফুজ্জামান মুনের মতো সারা দেশের আনাচে কানাচে ৬ হাজার ৬৮৬টি ডিজিটাল সেন্টারে কর্মরত ১৮ হাজারের অধিক উদ্যোক্তা এভাবেই বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। তাঁরা ব্যাংকিং এবং ই-কমার্স সেবাসহ ২৭০টির অধিক সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রদান করছেন। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের আওতায় এই সেন্টার স্থাপিত হয়। বর্তমানে এসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই) প্রোগ্রাম-এর মাধ্যমে ডিজিটাল সেন্টারের কাজ চলছে সারাদেশে। দারিদ্র্যমোচন, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অধিকাংশ অর্জনে এই ডিজিটাল সেন্টার ভূমিকা রাখছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে জনগণের দোরগোড়ায় সহজে, দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদ আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তাঁর কার্যালয় থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর ভোলা জেলার চর কুকরিমুকরি ইউনিয়নের সাথে যোগাযোগ করে দেশের ৪ হাজার ৫০১টি ইউনিয়নে একযোগে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র উদ্বোধন করেন যা বর্তমানে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি) নামে পরিচিত।
২০০৮ সালে রূপকল্প ২০২১ ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার মোবাইল ফোন সহজলভ্যতার নীতি গ্রহণের পাশাপাশি সাবমেরিন কেবলের সংযোগ স্থাপন করে। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে তারা ডিজিটাল সেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ইন্টারনেট অবকাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া এবং দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল স্থাপন করে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
বর্তমানে দেশে ইন্টারনেটের মোট গ্রাহকসংখ্যা ১০৩ মিলিয়ন যা ২০০৮ সালে ছিল ৯৪ মিলিয়ন। একই সঙ্গে দেশকে ডিজিটাইজেশনের লক্ষ্যে এগিয়ে নেয়ার জন্য নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে থ্রিজি ও ২০১৮ সালে ফোরজি টেকনোলজি গ্রহণ করা হয়েছে। এখন আমরা ৫জি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। ইন্টারনেটের সূত্রে ডিজিটাল সেবার বহুমুখীকরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। যার সরাসরি উপকারভোগী গ্রামের সাধারণ গরিব মানুষ।
গ্রামাঞ্চলে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর উপস্থিতির কারণে গ্রাম ও শহরের ব্যবধান ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে আসছে। ডিজিটাল অবকাঠামো গ্রামীণ গতিশীলতা বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে, তা বলাই বাহুল্যে। ২০১৮ সালে সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারের ৩.১০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘আমার গ্রাম–আমার শহর’: প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ-এর বাস্তবায়ন ঘটে চলেছে এভাবেই। নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার অংশ হিসেবে ইন্টারনেট বা তথ্য প্রযুক্তি সর্বত্র পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সরকার বাস্তবায়ন করে চলেছে।
বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে সেই নির্বাচনি ইশতেহারের ৩.২১ অনুচ্ছেদের অঙ্গীকার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নপূরণ: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ বিশাল অবদান রয়েছে।
এসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই) প্রোগ্রাম-এর তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল সেন্টার বর্তমানে ২৭০-এর অধিক সেবা প্রদান করে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জমির পর্চা, নামজারি, ই-নামজারি, পাসপোর্টের আবেদন ও ফি জমাদান, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, হজ রেজিস্ট্রেশন, সরকারি সেবার ফরম, টেলিমিডিসিন, জীবন বীমা, বিদেশে চাকরির আবেদন, এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, বাস-বিমান-লঞ্চ টিকেটিং, মেডিকেল ভিসা, ডক্টরের এপয়েনমেন্ট, মোবাইল রিচার্জ, সিম বিক্রয়, বিভিন্ন ধরনের কম্পিউটার এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ, ই-মেইল, কম্পোজ-প্রিন্ট-প্রশিক্ষণ, ফটো তোলা, ফটোকপি, সরকারি ফরম ডাউনলোড করা পরীক্ষার ফলাফল জানা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবদেন করা, অনলাইন ভিসার আবেদন করা, কৃষি পরামর্শ ও তথ্য সেবা ইত্যাদি।
একজন উদ্যোক্তা সেবা প্রদানের মাধ্যমে মাসে প্রায় ৫ হাজার থেকে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। গড়ে প্রতিমাসে ডিজিটাল সেন্টার থেকে ৬০ লক্ষেরও বেশি মানুষ সেবা গ্রহণ করে থাকে বলেও এটুআই সূত্রে জানা গেছে।
এ যাবৎ ডিজিটাল সেন্টার হতে মোট ৫৫.৪ কোটি সেবা প্রদান করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে নাগরিকদের ১৬৮ কোটি সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা ও ৭৬,৭৭৫ কোটি টাকা ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে। নাগরিকদের জীবনমান পরিবর্তনে ইতিবাচক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ডিজিটাল সেন্টার ২০১৪ সালে ই-গভর্নমেন্ট ক্যাটাগরিতে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (ITU)-এর ওয়ার্ল্ড সামিট অন ইনফরমেশন সোসাইটি (WSIS) অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছে।
২০১৩ সালে দেশে দেশের সকল পৌরসভার ‘পৌর ডিজিটাল সেন্টার (পিডিসি) এবং ১১টি সিটি কর্পোরেশনের সকল ওয়ার্ডে ‘নগর ডিজিটাল সেন্টার (সিডিসি)’ চালু করা হয়, ২০১৮ সালে ৬টি ‘স্পেশালাইজড ডিজিটাল সেন্টার (এসডিসি)’ চালু করা হয়। যার মধ্যে গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য গাজীপুরে ৫টি এবং মৎসজীবী শ্রমিকদের জন্য খুলনার রূপসায় ১টি, ২০১৮ সালে সৌদিআরবে ১৩টি ‘এক্সপাট্রিয়েট ডিজিটাল সেন্টার (ইডিসি)’ স্থাপন করা হয়, বর্তমানে সারাদেশে ডিজিটাল সেন্টারের সংখ্যা ৬৬৮৬টি (ইউডিসি-৪৫৭১, পিডিসি-৩২৮, সিডিসি-৪৬৫, এসডিসি-৬, ইউপিডিসি-৪৯২, ইডিসি-১৩, সাবসেন্টার-৮৮১), মোট উদ্যোক্তা ১৩ হাজারের অধিক এবং নারী উদ্যোক্তা ৫ হাজারের অধিক।
করোনা মহামারির সময়ে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলো টেলিমেডিসিন সেবার মাধ্যমে জনগণকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষে’ তৃণমূল জনগণকে ই-সেবা সম্পর্কে অবহিতকরণ, সেবাগ্রহণে মধ্যস্বত্বভোগী ও দুর্নীতির আশ্রয় নিরোধে ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে ‘মুজিব শতবর্ষ ই-সেবা ক্যাম্পেইন-২০২০’ পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ১১ অক্টোবর হতে ১০ নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত এই ক্যাম্পেইন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে সারাদেশে চলছে।
নাগরিকদের ২ কি.মি. আওতায় মধ্যে সেবাপ্রদান কার্যক্রম আনয়নের জন্য ২০২৩ সালের মধ্যে ১০ হাজার ডিজিটাল সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে এটুআই। সেবা তালিকায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নতুন নতুন সেবা সংযুক্তিকরণের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় প্রায় ৫০০ সরকারি-বেসরকারি সেবা এসকল সেন্টারের মাধ্যমে প্রদান করা হবে।
আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন, রোবটিকসের মতো প্রযুক্তিগুলো নিয়ে কাজ করতে হলে আমাদের দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। ডিজিটাল সেন্টারগুলো আমাদের দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সেই জনবল সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এখন আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। ডিজিটাল বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমাদের দেখিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়, সেটা আজ বাস্তবতা। আমরা এখন ঘরে বসে অনেক কাজ করছি, অনলাইনে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করছে, জরুরি মিটিং করা যাচ্ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতি হিসেবে ডিজিটাল সেন্টারকে সাথে নিয়ে আমাদের আরো দ্রুত এগোতে হবে। গ্রাম হবে শহর, এই স্বপ্নপূরণের দোরগোড়ায় আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি।
পরীক্ষিৎ চৌধূরী, তথ্য কর্মকর্তা, তথ্য অধিদপ্তর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

4 + 13 =

সবচেয়ে আলোচিত