ঢাকা   রবিবার, ২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯   সন্ধ্যা ৬:৪৫ 

সর্বশেষ সংবাদ

কুয়েতে দণ্ডিত এমপি পাপুলের সদস্যপদ বাতিল করে রুলিং দেবেন স্পিকার

কুয়েতে সাজাপ্রাপ্ত সংসদ সদস্য শহিদ ইসলাম পাপুলের সদস্যপদ বাতিল করে আজ কালের মধ্যেই রুলিং দেবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। কুয়েতের আদালতের রায়টি সংসদ সচিবালয়ের মাধ্যমে স্পিকারের কাছে পৌঁছার পর এ নিয়ে সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি পর্যালোচনা করে সদস্যপদ বাতিল করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সূত্রটি জানিয়েছে সংসদ সদস্য শহিদ ইসলাম পাপুলের সদস্যপদ বাতিল করে স্পিকারের রুলিং এর পর তা নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। নির্বাচন কমিশন লক্ষীপুর -২ আসন শূণ্য ঘোষণা করে উপ-নির্বাচনসহ পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।

উল্লেখ্য মানবপাচার ও অর্থপাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কুয়েতের আদালত গত ২৮ জানুয়ারি বাংলাদেশের সংসদ সদস্য পাপুলকে ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫৩ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। রায়ে কুয়েতের স্বারাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মাজেন আল জারাহকেও পাপুলের মতো কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। তবে কুয়েতের দুই পার্লামেন্ট সদস্য সাদুন হাম্মাদ আল-ওতাইবি এবং সালাহ আবদুলরেদা খুরশিদকে এ মামলার অভিযোগ থেকে খালাস দেন বিচারক।
বাংলাদেশের সংসদ সদস্য পাপুলকে গত ৬ জুন রাতে কুয়েতের মুশরিফ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির অন্যতম মালিক পাপুলের সেখানে বসবাসের অনুমতি ছিলো। পাপুলের বিরুদ্ধে মানবপাচার, অর্থপাচার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের শোষণের অভিযোগ মামল করেন পাচারের শিকার পাঁচ বাংলাদেশী।
কুয়েতের পাবলিক প্রসিকিউশন পরে তদন্ত করে পাপুলসহ নয়জনের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, মানবপাচার, ঘুষ লেনদেন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভঙ্গের অভিযোগ আনে।
অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পাপুলের মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু হয়। এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর মামলার রায় ঘোষণার জন্য তারিখ ঠিক করে দেন বিচারক।

আসামিদের মধ্যে মেজর জেনারেল মাজেন আল-জারাহ নাগরিকত্ব, পাসপোর্ট ও বসবাসের অনুমতি বিষয়ক দপ্তরের অ্যাসিসট্যান্ট আন্ডার সেক্রেটারি থাকা অবস্থায় ঘুষের বিনিময়ে পাপুলের বেশ কিছু কাজে সায় দেন বলে অভিযোগ ছিল।
আর কুয়েতের পার্লামেন্টের সদস্য সাদুন হাম্মাদ ও সালাহ খুরশিদের বিরুদ্ধেও বাংলাদেশি এমপির কাছ থেকে ‘ঘুষ নিয়ে’ অবৈধ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
সাধারণ শ্রমিক হিসাবে কুয়েত গিয়ে বিশাল সাম্রাজ্য গড়া পাপুল ২০১৮ সালে লক্ষ্মীপুর-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।নির্বাচনে ওই আসনটি আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু জাতীয় পার্টির প্রার্থী শেষ মুহূর্তে ভোট থেকে সরে দাঁড়ালে ‘বিএনপি ঠেকানোর’ কথা বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ পাপুলের পক্ষে কাজ করে বলে দলটির নেতাদের ভাষ্য।
পাপুল নিজে এমপি হওয়ার পর স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কোটায় পাওয়া সংরক্ষিত একটি আসনে তার স্ত্রী সেলিনা ইসলামকে এমপি করে আনেন।
প্রবাসী উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন পাপুল, যেখানে তার বড় অঙ্কের শেয়ার রয়েছে।
পাপুলের মালিকানাধীন মারাফি কুয়েতিয়া গ্রুপে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি কাজ করেন বলে জানা গেছে। পাপুলের কেলঙ্কারী ফাঁস হওয়ার পর বাংলাদেশে দুদকও পাপুল, তার স্ত্রী, শ্যালিকা ও মেয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। পাপুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম ও মেয়ে ওয়াফা ইসলাম সেই মামলায় জামিনে আছেন।
কুয়েতের আদালতের দেওয়া রায়ের কপি গত ১৮ ফেব্রুয়ারী সংসদ সচিবালয়ে পৌঁছে। সে সময় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, “রায়ের কপি পর্যালোচনা করে সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” এ সম্পর্কে জানতে চাইলে সংসদ সচিব জাফর আহমেদ খান বলেন, “মামলার রায়ের কপি সংসদ পেয়েছে। এ বিষয়ে কাজও শুরু হয়েছে। স্পিকার মহোদয় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।”
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হল সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতা হারান।মুক্তি পাওয়ার পর পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি আর সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হন না। ওই অনুচ্ছেদেই বলা আছে, কোন বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিলে কিংবা কোন বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে আর এমপি হিসেবে থাকতে পারবেন না।বাংলাদেশের কোনো আইনপ্রণেতার এভাবে বিদেশে দণ্ডিত হওয়ার এটাই প্রথম ঘটনা।
এ দিকে কারাদণ্ড ও নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের কারণে পাপুল আর সংসদ সদস্য পদে থাকতে পারেন না বলে মনে করেন সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ।
আইন আদালতকে তিনি বলেন, “সংবিধানে যা বলা হয়েছে, সে ব্যাপারে সংসদকে ব্যবস্থা নিতে হবে। সংসদের কাছে রেকর্ড পৌঁছালে ৬৬ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ আসন শূন্য ঘোষণা করবে।” কোনো সংসদ সদস্য গ্রেপ্তার, আটক বা আদালতের রায়ে সাজা পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা স্পিকারকে জানাতে হয়। পাপুল গ্রেপ্তার এবং সাজা পাওয়ার পর তা নিয়ম অনুযায়ী স্পিকারকে জানানোয় এখন বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

16 + 13 =

সবচেয়ে আলোচিত