ঢাকা   মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯   রাত ১:০২ 

সর্বশেষ সংবাদ

অবিলম্বে পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান

অবিলম্বে পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। শনিবার বিকেলে ‘বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং পাকিস্তানি গণহত্যাকারীদের বিচার’ শীর্ষক নির্মূল কমিটির এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে এ আহ্বান জানানো হয়।
নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আ ক ম মোজাম্মেল হক।
ওয়েবিনারে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘এ বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনকালে আমাদের মনে রাখতে হবে ২০২১ সাল বাংলাদেশের গণহত্যারও ৫০ বছর। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবির কারণে বর্তমান সরকার ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
নির্মূল কমিটি গত ১৫ বছর ধরে দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি এবং গণহত্যাকারীদের বিচারের জন্য আন্দোলন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকালে ভারত ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সরকার, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিশিষ্ট নাগরিকরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় সহযোগীদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যার ভয়াবহতা ও ব্যাপকতা তুলে ধরে এর প্রতিবাদ করেছেন। নির্মূল কমিটি ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে সব সংগঠন ও ব্যক্তি কাজ করছেন তারাও বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের গণহত্যার বিষয়টি তুলে ধরে গণহত্যাকারীদের বিচারের পক্ষে জনমত সংগঠিত করছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগহীনতা দুর্ভাগ্যজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পর বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ও বিদেশের যাবতীয় বাধা অগ্রাহ্য করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া আরম্ভ করেছিলেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই বিচার প্রক্রিয়া এখন স্থবির হয়ে পড়েছে। কী কারণে দুটি ট্রাইব্যুনালকে কমিয়ে একটিতে নামিয়ে আনা হলো, কী কারণে ট্রাইব্যুনালে এখনও পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী এবং গণহত্যাকারী অন্যান্য সংগঠনের বিচার হচ্ছে না, তা আমাদের বোধগম্য নয়। ৭১ এর গণহত্যার ৫০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার প্রাক্কালে আমরা আবারও দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে ৭১ এর গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং পাকিস্তানি গণহত্যাকারীদের বিচার আরম্ভ করতে হবে।’
ওয়েবিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতির মতো বিষয়গুলোতে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে আসে। “বাংলাদেশে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি” এখন জাতীয় দাবি। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে নির্মূল কমিটির সহযোগিতায় কাজ করলে এই দাবি পূরণ হবে বলে আমি মনে করি। আমাদের দূতাবাসগুলো বাংলাদেশের একাত্তরের গণহত্যার নৃশংসতা, ভয়াবহতা বহির্বিশ্বের কাছে তুলে ধরার কাজে সর্বদা নিয়োজিত।’
সরকারের বিচ্যুতি ও ভুল-ভ্রান্তি তুলে ধরার ক্ষেত্রে নির্মূল কমিটি তার ভূমিকা সাফল্যের সঙ্গে পালন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে জাতি তার ইতিহাসকে লালন করে না, সে জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। যে চার মূলনীতির ভিত্তিতে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এগুলোর একটিও থেকে বিচ্যুত হলে আমরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না।’
এতে অংশ নিয়ে নির্মূল কমিটির যুক্তরাজ্য শাখার নির্বাহী সভাপতি সৈয়দ এনামুল ইসলাম বলেন, ‘নির্মূল কমিটি এ বছরকে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের বছর ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে। অথচ লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের একটি আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার ছাড়া এ বিষয়ে সরকারের আর কোনও উদ্যোগ আমার চোখে পড়েনি।’
‘কয়েক বছর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করার ঘোষণা এসেছিল। সম্ভবত কোনো কারণে সরকার পাকিস্তানি ঘাতকের বিচার শুরু করতে ইতস্তত করছেন। আমরা আজকের ওয়েবিনারের প্রধান অতিথি মাননীয় মন্ত্রীর মাধ্যমে সরকারের নিকট দাবি জানাই, অবিলম্বে হানাদার পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করুন। বিচারের জন্য পাকিস্তান এই যুদ্ধাপরাধীদের বাংলাদেশের হাতে তুলে না দিলে পাকিস্তানের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করুন,’ যোগ করেন তিনি।
মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘ আমাদের স্বাধীনতার পর চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ পাকিস্তানের পক্ষ নেয়ায় বাংলাদেশের গণহত্যা এখনও জাতিসংঘে স্বীকৃতি পায়নি। এখন পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমাদের এই দাবি নিয়ে নতুন করে এগুতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক লবি। এখনও নিশ্চয়ই পাকিস্তান এবং সে দেশের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু চীন আমাদের দাবির বিরোধিতা করবে। কিন্তু তারপরেও আমরা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সমর্থন আশা করতে পারি যদি যথোপযুক্ত লবি চালিয়ে যাওয়া যায়। এ ব্যাপারে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ফলপ্রসূ ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। ভারত এবং অন্যান্য বন্ধু রাষ্ট্রের সাহায্যের উপর ভিত্তি করে আমরা এগিয়ে গেলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পথ খুলে যাবে। বাংলাদেশে গণহত্যায় অংশগ্রহণকারী পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের বিচারের বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এমন ভূমিকা রাখতে হবে যেন পাকিস্তানের ওপর বিভিন্ন দেশ চাপ সৃষ্টি করতে পারে।’
ওয়েবিনারে আরও বক্তব্য দেন নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, প্রজন্ম ৭১ এর সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময়, নির্মূল কমিটির সুইজারল্যাণ্ড শাখার সভাপতি মানবাধিকার নেতা খলিলুর রহমান, নির্মূল কমিটির অস্ট্রেলিয়া শাখার সভাপতি ডা. একরাম চৌধুরী, নির্মূল কমিটির বেলজিয়াম শাখার সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার নেত্রী আনার চৌধুরী, নির্মূল কমিটি কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল প্রমুখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

4 × 5 =

সবচেয়ে আলোচিত