ঢাকা   সোমবার, ২০ মে ২০২৪, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১   দুপুর ২:৪০ 

সর্বশেষ সংবাদ

রোহিঙ্গা গণহত্যা : আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের একটি নির্দেশনাও বাস্তবায়ন করেনি মিয়ানমার

রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়াসহ জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) যে রায় ঘোষণা করেছিল, গত ২০ মাসে রায়ের একটি নির্দেশনাও বাস্তবায়ন করে নি মিয়ানমার। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে জোর করে বিতাড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ফিরিয়ে নেয়ার সব উদ্যোগই থেমে গেছে। এ নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনাও যেমন ঝিমিয়ে গেছে তেমনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালত গত বছর (২০২০) ২৩ জানুয়ারী বাস্ত্যুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য যে নির্দেশ ও রায় দিয়েছিল তার কোনো নির্দেশনাই বাস্তবায়ন করেনি মিয়ানমার। বরং দেশটির শাসন ক্ষমতাই এখন পাল্টে গেছে। রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদে সেনাবাহিনীর ভূমিকাকে যিনি সমর্থন জানিয়েছিলেন সেই গণতান্ত্রিক নেত্রী অং সান সু চির সরকারকে উচ্ছেদ করে দেশটির শাসন ক্ষমতায় এখন সামরিক বাহিনী। দেশজুড়ে চলছে সামরিক বাহিনীর গণহত্যা। চলতি বছরের পয়লা ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থান করার পর থেকেই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দেশটির বেসামরিক নেত্রী এবং ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) দলের প্রধান অং সান সু চিকে আটক করে রেখেছে সামরিক জান্তা। এই গোলমালে পড়ে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়টি এখন ভুলতেই বসেছে মিয়ানমার। এ নিয়ে তারা আর আলোচনাই করছে না। নিজেদের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র করেছে ভাসানচরে। সেখানে কয়েকশ রোহিঙ্গা পরিবারকে নেয়া হয়েছে। এই রোহিঙ্গারা কবে ফিরে যাবে নিজ দেশে তা এখন অনিশ্চিত। রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে সেখানে তাদের জায়গাজমিতে ইপিজেড, সেনানিবাসসহ নানা স্থাপনা গড়ে তুলছে মিয়ানমার। চীনের আর্থিক সহায়তায় গড়ে তোলা হচ্ছে এসব স্থাপনা। ফলে নিজ ভূমিতে রোহিঙ্গারা আদৌ ফিরে যেতে পারবে কী না এ নিয়ে সন্দেহ দিন দিন বাড়ছে। মিয়ানমার যেমন আন্তর্জাতিক আইন আদালতের তোয়াক্কা করছে না তেমনি আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ও তারা মানছে না। গতবছরের (২০২০) ২৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) তাদের রায়ে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সুরক্ষায় মিয়ানমারকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা এবং রাখাইন থেকে বাস্ত্যুচুত ও নিহতদের পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছিল। নেদারল্যান্ডসের রাজধানী দ্য হেগে আইসিজের প্রধান বিচারপতি আবদুল কাভি আহমেদ ইউসুফের নেতৃত্বে ১৭ জন বিচারক প্যানেল সর্বসম্মতক্রমে রায় ঘোষণা করেছিলেন।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়ে যা বলা হয়েছিল:
১. রাখাইনে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের অধিকারের সুরক্ষায় এখনও কোনও ধরনের প্রস্তাব দেয়নি মিয়ানমার।
২. জরুরি ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নেয়ার দরকার হলেও মিয়ানমার তা করেনি।
৩.দেশটিকে অবশ্যই গণহত্যার সনদ মানতে হবে।
৪. আর কোনও ধরনের হত্যাকাণ্ড যাতে না ঘটে সেজন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. দেশটির সামরিক বাহিনী ও অন্যান্য সামরিক শাখা গণহত্যা সংঘটিত করবে না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
৬. রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সব ধরনের অপরাধের আলামত সংরক্ষণের নির্দেশ।
৭. আইসিজে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, সেব্যাপারে আন্তর্জাতিক আদালতের কাছে আগামী চার মাসের মধ্যে মিয়ানমারকে অবশ্যই প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।
৮.প্রথম প্রতিবেদন দাখিলের পর প্রতি ছয় মাস পরপর একই ধরনের প্রতিবেদন আদালতের কাছে উপস্থাপন করতে হবে।
আইসিজের প্রধান বিচারপতি আবদুল কাভি আহমেদ ইউসুফ তার মন্তব্যে বলেছিলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা অত্যন্ত ঝুঁকিতে আছেন। এছাড়া বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমার সরকার যে ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে তা পর্যাপ্ত নয় বলেও আদালতের রায়ে উঠে আসে।
রায়ে বলা হয়, রাখাইনে জাতিগত সংহতি, শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি মিয়ানমার। এই আদেশের উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া গণহত্যা সনদের ২ নং ধারা অনুযায়ী মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে একটি বিশেষ সুরক্ষার অধিকারী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে বলে বলা হয় রায়ে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ এনে ২০২০ সালের নভেম্বরে মামলা করেছিল গাম্বিয়া। ২০২০ সালের ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর এ মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গাম্বিয়ার পক্ষে মামলার শুনানিতে নেতৃত্ব দেন দেশটির বিচার বিষয়ক মন্ত্রী আবুবকর তামবাদু। অন্যদিকে মিয়ানমারের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন দেশটির নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চি। সেসময় শুনানিতে মামলাকারী গাম্বিয়া রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যাতে আর কোনও ধরনের সহিংসতার ঘটনা না ঘটে সে লক্ষ্যে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ৫টি আদেশ চেয়েছিল।
রায়ে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ এই আদালত বলেছেন, গণহত্যা সনদের ৪১ ধারার আওতায় তিনটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশের শর্ত বিরাজ করছে। গাম্বিয়া সংখ্যালঘু এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় অন্তর্বর্তী যেসব ব্যবস্থার আদেশ চেয়েছে; সেগুলোর প্রথম তিনটির লক্ষ্য হচ্ছে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

আইসিজেতে যে ভাবে মামলা:
জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের নভেম্বরে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ এনে মামলা করে গাম্বিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক এ আদালতে গণহত্যার দায়ে তৃতীয় মামলা ছিল এটি।
গাম্বিয়া ও মিয়ানমার দুই দেশেই ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ। জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী হিসেবে শুধু গণহত্যা থেকে বিরত থাকা নয় বরং এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ এবং অপরাধের জন্য দেশগুলো বিচারের মুখোমুখি হতে বাধ্য।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে প্রথম জেনোসাইড কনভেনশন মামলা হয়েছিল সার্বিয়ার বিরুদ্ধে ১৯৯৩ সালে। এ মামলায় সার্বিয়া বসনিয়া হার্জেগোভিনিয়ায় গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছিল বলে প্রমাণ হয়।
কানাডা, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, তুরস্ক এবং ফ্রান্স জোর দিয়ে বলেছে যে, রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার গণহত্যা চালিয়েছে। ইসলামী দেশসমূহের সংগঠন ওআইসি তার ৫৭টি সদস্য দেশকে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আদালতে তোলার কাজে সহায়তা করে।
যেভাবে মামলার তদন্ত :
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মিয়ানমারের বিচারের এখতিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আছে বলে সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। ২০২০ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান প্রসিকিউটর ফাতো বেনসুদা মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর রোহিঙ্গাদের ওপর যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা তা নিয়ে তদন্ত শুরু করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আইসিসির অনুমতি চান প্রসিকিউটর ফাতো বেনসুদা। জুলাই মাসে (২০১৯) তার তদন্ত দল বাংলাদেশে এসে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছ থেকে ব্যাপক তথ্য সংগ্রহ করে।
এরপর প্রাথমিক তদন্ত শেষে পূর্ণ তদন্তের জন্য আবেদন করেন ফাতো বেনসুদা, যাতে সায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারকরা। ফলে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিপীড়নের ঘটনায় কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে তদন্ত শুরু হয়।
তবে শুরুর দিকে অনেকে এ প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। কারণ মিয়ানমার আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র নয়। একইভাবে আইসিসির প্রতিনিধি দলকেও রাখাইনে পরিদর্শনে যাওয়ার অনুমতিও দেয়নি।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত সামরিক অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। সামরিক বাহিনীর জ্বালাও-পোড়াও, খুন, ধর্ষণের মুখে অন্তত ১২ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জাতিসংঘ মিয়ানমার সামরিক বাহিনী এই অভিযান গণহত্যার অভিপ্রায়ে পরিচালনা করেছে বলে মন্তব্য করেছে।
রায়ে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ার দায়েরকৃত মামলার পক্ষে রোহিঙ্গা নিপীড়ন ও গণহত্যার যেসব আলামত আদালতের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেসব বিরোধের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনীর রক্তাক্ত অভিযানের ঘটনায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সেটাই ছিল আন্তর্জাতিক কোনও আদালতের প্রথম আদেশ। এই আদেশ মিয়ানমারকে মানতে বাধ্য করার মতো ক্ষমতা আন্তর্জাতিক আদালতের না থাকলেও জাতিসংঘের যে কোনও সদস্য দেশ এ আদেশের ভিত্তিতে দেশটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নিরাপত্তা পরিষদের কাছে অনুরোধ জানাতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্য রোহিঙ্গাদের পক্ষে কেউ এগিয়ে আসছে না। জাতিসংঘে এ ইস্যুটি তোলার জন্য চেষ্টা হলেও চীন বরাবরাই এটা বাধা দিয়ে আসছে। বলা যায় চীনের সমর্থনের কারণেই মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিচ্ছে না। আর এখন সেখানে যে সামরিক শাসন চলছে তাও চীনের সমর্থনপুষ্ট। ফলে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গারা তাদের নিজ দেশ মিয়ারমারে ফিরে যাওয়া অনিশ্চিত হয়েই গেলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সবচেয়ে আলোচিত