মুনিয়ার ভিসেরা রিপোর্ট নিয়ে রহস্য, আনভীরকে অব্যাহতি দিয়ে পুলিশ রিপোর্টের বিরুদ্ধে নারাজি দেবেন বাদি

0
226

কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলায় বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরকে অব্যাহতি দিয়ে পুলিশের ফাইনাল রিপোর্টের বিরুদ্ধে নারাজি দেবেন মামলার বাদি। নিহত মুনিয়ার বোন মামলার বাদি নুসরাত জাহান তানিয়া জানিয়েছেন, তিনি আদালতে নারাজি আবেদন দাখিল করবেন। এ জন্য আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছেন। আগামি ২৯ জুলাই ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট মোর্শেদ আল মামুন ভুইয়ার আদালতে পুলিশ রিপোর্ট গ্রহণ করা হবে কী না এর শুনানি রয়েছে। সে দিনই তিনি নারাজি দেবেন বলে জানিয়েছেন।

(মামলার বাদি নুসরাত জাহান তানিয়া)
নুসরাত জাহান তানিয়া বলেন, মূল আসামিকেই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, এটা তো অন্যায়। আমি আদালতে নারাজি দেবো। আনভীরকে যদি অব্যাহতি দেওয়া হয়, তাহলে দেশে অন্যায়ের বিচার হবে কী করে?
তানিয়া বলেন, পুলিশ শুরুতেই বলছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করা হবে। কিন্তু আনভীর জড়িত থাকার পরও তাকে কেন অব্যাহতি দেওয়া হলো, সেটা তো আমি জানি না। তানিয়া প্রশ্ন করেন মুনিয়ার ময়না তদন্ত কবে হয়েছে, কী তার রিপোর্ট, ভিসেরা রিপোর্টে কি এসেছে কিছুই তারা জানতে পারেন নি। পুলিশ তাদের কিছুই জানায়নি। সবকিছুই যেনো গোপন করে রাখার চেষ্টা চলছে।
উল্লেখ্য কোনো মামলায় পুলিশ রিপোর্ট বাদির পছন্দ না হলে তিনি ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ২০০ ধারা অনুযায়ি নারাজি আবেদন দাখিল করতে পারেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ম্যাজিষ্ট্রেট মামলাটি পুন:তদন্ত এবং তদন্তকারি কর্মকর্তা পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে পারেন। আর নারাজি খারিজ হলে এর বিরুদ্ধে দায়রা জজ আদালতে আপিল করতে পারেন বাদি। হাইকোর্টে রিভিশন করার সুযোগও রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। তবে আইনগত ভাবে আসামির নারাজি আবেদনের সুযোগ নেই।

(আনভীর ও মুনিয়া-ছবি সংগৃহীত)।
উল্লেখ্য, কলেজছাত্রী মুনিয়ার আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলায় বসুন্ধরা শিল্প গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের সংশ্লিষ্টতা পায়নি পুলিশ। তাই মামলার তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ১৯ জুলাই আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ।
তবে আইনবিশেষজ্ঞরা বলছেন এ ধরণের একটি চাঞ্চল্যকর মামলায় যেখানে সুনির্দিষ্ট আসামি রয়েছে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ না করেই মামলা ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়ায় তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হবেই।
কেউ আসামী হলেই তাকে অপরাধী বলা যাবে না। কিন্তু এটা প্রমাণ করার জন্য বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হতে হবে। আলোচিত মামলাটি শুরু থেকেই কেমন যেনো “ঢাক ঢাক গুড় গুড়” আচরণ করছে পুলিশ।
গত ২৬ এপ্রিল রাতে গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে মুনিয়ার মরদেহ উদ্ধারের পর দায়ের হওয়া মামলায় আসামি করা হয় দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরকে। মামলায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
ঘটনার রাতেই মুনিয়ার বোন নুসরাত বাদি হয়ে গুলশান থানায় মামলাটি করেন। মামলার অভিযোগ করা হয়, এক বন্ধুর মাধ্যমে পরিচয়ের পর ২০১৯ সালে আনভীর মুনিয়াকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে বনানীতে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনভীরের পরিবার মুনিয়ার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্কের কথা জানতে পারে। তখন আমার বোনকে (মুনিয়াকে) আনভীরের জীবন থেকে সরে যাওয়ার জন্য হুমকি দেন তার মা।
এ ঘটনার পর আনভীর মুনিয়াকে কৌশলে কুমিল্লায় পাঠিয়ে দেন এবং পরে বিয়ে করবেন বলে আশ্বাস দেন। গত মাসের (মার্চ) ১ তারিখে গুলশানের ১২০ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর বাসার বি/৩ ফ্যাটটি ভাড়া নেন আনভীর। ১ মার্চ থেকে মুনিয়া সেই ফ্ল্যাটেই ছিলেন এবং আনভীর মাঝে মাঝে ওই ফ্ল্যাটে আসা যাওয়া করতেন।

গত ২৩ এপ্রিল ফ্ল্যাট মালিকের বাসায় ইফতার পার্টিতে গিয়ে মুনিয়া ছবি তোলেন। ফ্ল্যাট মালিকের স্ত্রী ফেসবুকে সেই ছবি পোস্ট করলে সেটি আনভীরের পরিবারের একজন দেখে ফেলেন এবং আনভীরকে জানান। বিষয়টি নিয়ে আনভীর মুনিয়াকে বকাঝকা করেন এবং হুমকি দেন। ২৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে মুনিয়া তার মোবাইল নম্বর থেকে নুসরাতকে ফোন করে কান্নাকাটি শুরু করেন।
তিনি বলেন, ‘আনভীর আমাকে বিয়ে করবে না, সে শুধু আমাকে ভোগ করেছে। এছাড়া আমাকে সে ‘মনে রাখিস তোকে আমি ছাড়ব না’ বলে হুমকি দিয়েছে।
এজাহারে বলা হয়েছে, মুনিয়া নুসরাতের কাছে চিৎকার করে বলেন, ‘যেকোনো সময় আমার বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তোমরা তাড়াতাড়ি ঢাকায় আসো।’
মোসারাত জাহান মুনিয়া মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। তার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
গুলশান থানা সূত্রে জানা যায়, মুনিয়া নিহত হওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। বাড়ির মালিক, মালিকের মেয়ের জামাইসহ বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মামলা সংক্রান্ত বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন তারা। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করেছে পুলিশ।
মুনিয়া যে ফ্ল্যাটটিতে থাকতেন সেই ভবনের বেশকিছু সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও সংগ্রহ করে পুলিশ। সেসব সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ওই ফ্ল্যাটে সায়েম সোবহান আনভীরের যাতায়াতের প্রমাণ পায় তারা। তবে ঘটনার দিন বা এর আগের দিন মুনিয়ার ফ্ল্যাটে আনভীরের যাতায়াতের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া সিসিটিভি ফুটেজে এই দুই দিন সন্দেহজনক কারও যাতায়াত ওই বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাটের আশপাশে পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর মুনিয়ার সঙ্গে আনভীরের যে ফোনকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তাতে দেখা যায়,আনভীর মুনিয়াকে টাকা চুরির দায়ে অভিযুক্ত করে টাকা ফেরত দেয়ার হুমকি দেন। এই ফোন রেকর্ড পুলিশ সংগ্রহ করেছে কী না এবং এর কোনো রাসায়নিক বা ফরেনসিক পরীক্ষা হয়েছে কী না তা জানায়নি পুলিশ। এ ছাড়া মুনিয়ার মৃতদেহের ময়নাতদন্ত রিপোর্টে কি আছে তাও জানা যায় নি। মুনিয়ার বাসা থেকে পাওয়া তার ডায়রিসহ বিভিন্ন আলামত থেকে কি পাওয়ার গেছে এসব কিছুই জানায়নি পুলিশ।
উল্লেখ্য মুনিয়াকে বিষ প্রয়োগ কিংবা ধর্ষণ করা হয়েছিল কিনা এমন বেশ কয়েকটি বিষয় পরীক্ষার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়েছিল। এ জন্য ভিসেরা, ডিএনএ ও মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষা করতে মহাখালি সিআইডির ল্যাবরটরিতে আলামত পাঠানো হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সেলিম রেজা এই রিপোর্ট পাঠানোর কথা জানালেও রিপোর্টের বিষয়ে কিছু জানাতে রাজি হননি। রিপোর্ট এসেছে কী না তাও বলতে চাননি। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। এ ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিসেরা রিপোর্ট,ডিএনএ প্রোফাইলিং, মাইক্রো বায়োলজিক্যালসহ সব মিলিয়ে দুমাসের মধ্যে রিপোর্ট পাওয়া সম্ভব। তবে মুনিয়ার মৃতদেহের রিপোর্টে কি আছে তার সবকিছুই যেনো রহস্যঘেরা।
মামলার বাদি এ বিষয়গুলো উল্লেখ করে বলেছেন, পুলিশ তাদের অভিযোগ আমলেই নেয়নি। মুনিয়ার বোন ও মামলার বাদি জানান তিনি বিভিন্নভাবে হুমকির সম্মুখিন হচ্ছেন। নিররাপত্তা চেয়ে গত মে মাসেই তিনি কুমিল্লা সদর থানায় জিডি করেন। তিনি যে ব্যাংকে চাকরি করতেন কানো কারণ ছাড়াই তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে জানান ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

16 + 17 =