ঢাকা   শুক্রবার, ৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯   রাত ১:১৬ 

সর্বশেষ সংবাদ

সুপ্রিমকোর্ট বারে এক মাস পর ফল ঘোষণা; সভাপতি মোমতাজ, সম্পাদক দুলাল: দুপক্ষের মারামারি ভাঙচুড়

সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ফলাফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের মধ্যে মারামারি,ভাঙচুড়ের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি ঠেকাতে পুলিশ মোতায়েন করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন সংক্রান্ত নতুন সাব কমিটির সদস্যরা ভোট পুনর্গণনা করে রাত ১০ টায় ফলাফল ঘোষণা করেন। এতে আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্যানেলের সভাপতি পদে সিনিয়র এডভোকেট মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির ও সম্পাদক পদে মো. আবদুন নুর দুলাল’কে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
নির্বাচন সংক্রান্ত নতুন সাব কমিটির প্রধান এডভোকেট অজি উল্লাহ বুধবার রাত ১০ টার দিকে ফলাফল ঘোষণা করেন। খবর বিডিনিউজ/বাসস।
সভাপতি পদে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ সমর্থিত মোমতাজ উদ্দিন ফকির পেয়েছেন ৩২৪৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল সমর্থিত নীল প্যানেলের ব্যারিষ্টার মো. বদরুদ্দোজা (বাদল)
পেয়েছেন ২৪৭৯ ভোট।
সম্পাদক পদে মো. আবদুন নুর (দুলাল)কে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি পেয়েছেন ২৮৯১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল সমর্থিত নীল প্যানেলের মোঃ রুহুল কুদ্দুস (কাজল) পেয়েছেন ২৮৪৬ ভোট। এ পদে ভোটের ব্যবধান হলো ৪৫।
সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির দুইদিনব্যাপী ভোটগ্রহণ গত ১৫ ও ১৬ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৭ মার্চ রাতে ভোট গণনা আলাদা আলাদা ১০টি টেবিলে সম্পন্ন হলেও নির্বাচন সংক্রান্ত সাব-কমিটি সব টেবিলের ফলাফল যোগ করে তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে পারেনি। সম্পাদক পদে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ সমর্থিত প্রার্থী আবদুন নুর দুলাল ব্যালট পুনরায় গণনার দাবি জানান। এ নিয়ে দফায় দফায় হট্টগোল সৃষ্টি হয়। নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত কমিটি এ নিয়ে ফল ঘোষণা বন্ধ রেখে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন। সাব-কমিটি প্রধান সিনিয়র এডভোকেট এ ওয়াই মশিউজ্জামান দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করে লিখিত দেন।
ফলাফল ঘোষণা অনিশ্চয়তায় পড়ে। এ অবস্থা নিরসনে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও সম্পাদকরা একটি বৈঠকে মিলিত হলেও ফলাফল ঘোষণা উদ্যোগ দেখা যায়নি।
এরই ধারাবাহিকতায় সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির ২০২১-২০২২ বর্ষের নির্বাচিত বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ সমর্থিত ৭ সদস্য বসে ফলাফল ঘোষণায় একটি কমিটি গঠন করেন। যার প্রধান করা হয় সুপ্রিমকোর্ট বার এর সাবেক সহসভাপতি এডভোকেট অজি উল্লাহকে। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে অজি উল্লাহ নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি ২৭ এপ্রিল ভোট পুনর্গণনা করে ফলাফল ঘোষণা করা হবে বলে জানান।

এদিকে এডভোকেট অজি উল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত কমিটিকে অবৈধ দাবি করে বুধবার সংবাদ সম্মেলন করেন সম্পাদক প্রার্থী ব্যারিষ্টার মো. রুহুল কুদ্দুস (কাজল) সহ কমিটির বিএনপি ও সমমনা সমর্থিত নেতৃবৃন্দ।
বুধবার সম্পাদক পদের ভোট পুনরায় গণনা করা হয়েছে। অন্যান্য পদে আগের গণনা বহাল রেখে ভোট যোগ করে ঘোষণা করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ সমর্থিত সাদা প্যানেল কার্যনির্বাহী কমিটির ১৪টি পদের মধ্যে সভাপতি, সম্পাদক, সহসভাপতি ২ টি, কার্যনির্বাহী সদস্য ৩টি সহ মোট ৭টি পদে বিজয়ী হয়েছেন। অপরদিকে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল সমর্থিত নীল প্যানেল কোষাধ্যক্ষ, দুটি সহসম্পাদক, চারটি সদস্যসহ মোট ৭ টি পদে বিজয়ী হয়েছেন।
সাদা প্যানেলের বিজয়ী প্রার্থীরা হলেন-সভাপতি পদে সিনিয়র এডভোকেট মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির, সম্পাদক আবদুন নুর (দুলাল),সহ-সভাপতি পদে মো. শহীদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ হোসেন। সদস্য পদে বিজয়ী হয়েছেন তিনজন। নির্বাচিতরা হলেন-ফাতেমা বেগম, শাহাদাত হোসাইন (রাজিব) ও সুব্রত কুমার কুন্ডু।
নীল প্যানেলের বিজয়ী প্রার্থীগণ হলেন কোষাধ্যক্ষ পদে মোহাম্মদ কামাল হোসেন, সহ-সম্পাদক পদে মাহফুজ বিন ইউসুফ ও মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান খান। সাতটি সদস্য পদের মধ্যে নীল প্যানেল থেকে চার জন নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচিতরা হলেন- কামরুল ইসলাম, মাহদীন চৌধুরী, মো. গোলাম আক্তার জাকির ও মো. মঞ্জুরুল আলম (সুজন)।
নির্বাচন পরিচালনায় সিনিয়র এডভোকেট এ ওয়াই মশিউজ্জামানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের নির্বাচন উপ-কমিটি নির্বাচন ভোটগ্রহণের কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। পরবর্তীতে এ কমিটি সরে দাঁড়ান।
গত ১৫ মার্চ ও ১৬ মার্চ এ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। মোট ৮ হাজার ৬২৩ জন আইনজীবী ভোটারের মধ্যে ৫ হাজার ৯৮২ জন আইনজীবী ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
ভোট নেয়ার জন্য সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে ৫২টি বুথ স্থাপন করা হয়। সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে ১৫ ও ১৬ মার্চ দুই দিনই সকাল ১০ টা থেকে বিকেল ৫ টা আইনজীবীরা ভোট দিয়েছেন।
কার্যকরী কমিটির সভাপতি পদে একটি, সহ-সভাপতি পদে দুটি, সম্পাদক পদে একটি, কোষাধ্যক্ষ পদে একটি, সহ-সম্পাদক পদে দুটি ও কার্যকরী কমিটির সদস্য পদে সাতটি পদসহ সর্বমোট ১৪টি পদে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এর মধ্যে কার্যকরী কমিটির সাতটি সদস্য পদের ভোট ডিজিটাল পদ্ধতিতে গণনা সম্পন্ন হয়। বাসস।
ভোটের ফল ঘোষণা নিয়ে হাতাহাতি, কিল-ঘুষি:
এদিকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের তিনতলার সম্মেলন কক্ষের সামনে বুধবার ভোটের ফল ঘোষণা নিয়ে মারামারিতে জড়ায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা।
বুধবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আইনজীবী সমিতি ভবনের তিনতলায় সম্মেলন কক্ষের সামনে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে হাতাহাতি, পরে কিল-ঘুষির পর কক্ষের জানালার কাচ ভাঙচুর করা হয়।
সমিতির সাবেক সহ সভাপতি, আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের নেতা মো. অজি উল্লাহর নেতৃত্ব একটি দল নতুন উপ-কমিটি গঠন করে ভোট পুনর্গণনার পর ফল ঘোষণার দাবিতে সম্মেলন কক্ষে ঢুকতে গেলে মারামারির সূত্রপাত।
সমিতির ওই কক্ষেই গত মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ব্যালটসহ অন্যান্য জিনিসপত্র রাখা আছে।
অজি উল্লাহর নেতৃত্বে ভোট পুনর্গণনা করে নতুন সাত সদস্যের নির্বাচন পরিচালনা উপ-কমিটি ফল ঘোষণা করবে বলে মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছিল।
অজি উল্লাহর নেতৃত্বে বুধবার আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা ভোট পুনর্গণনার জন্য ঢুকতে গেলে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ধাক্কা-ধাক্কি, হাতাহাতি, কিল-ঘুষির মধ্যে কক্ষের তালা ভেঙে অজি উল্লাহরা ভেতরে ঢুকে পড়লে বিএনপি সমর্থকরা কক্ষের কাচ ভাংচুর করে। বাইরে থেকে বিএনপি কক্ষের বিদ্যুৎ সংযোগও বন্ধ করে দেয়া হয়। মারামারির পর কক্ষের ভেতরে অজি উল্লাহরা ব্যালট পুনর্গণনা শুরু করেন। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থকরাও বাইরে অবস্থান নেন।
এই পরিস্থিতিতে সেখানে পুলিশ অবস্থান নেয়। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের তিনতলার সম্মেলন কক্ষের সামনে বুধবার ভোটের ফল ঘোষণা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা মুখোমুখি হলে হাতাহাতি ও কিল-ঘুষিও চলে।
গত ১৫ ও ১৬ মার্চ সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হয় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ ওয়াই মশিউজ্জামানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের নির্বাচন উপ-কমিটির অধীনে।
একদিন পর ১৭ মার্চ ভোট গণনা করে রাতে ফল ঘোষণার সময় আওয়ামী সমর্থক আইনজীবী প্যানেল পক্ষের সম্পাদক প্রার্থী ভোট পুনর্গণনার দাবি করে লিখিত আবেদন জানালে ফল ঘোষণা আটকে যায়।
এরপর ফল ঘোষণা না করে মশিউজ্জামান সমিতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন বলে খবর আসে।
ফলে আটকে থাকার মধ্যে এক মাস ১৩ দিন পর মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট ল রিপোর্টার্স ফোরামে সংবাদ সম্মেলন করে সাবেক সহ-সভাপতি অজি উল্লাহ দাবি করেন, গত ১২ এপ্রিল সমিতির কার্যকরি কমিটির মেয়াদের শেষ এক সভায় তাকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি নির্বাচন উপ কমিটি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি নির্বাচন পরবর্তী অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার জন্য গত ১৬ এপ্রিল থেকে কার্যক্রম শুরু করেছি। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীকে (সম্পাদক) নোটিস করি, বারের অফিসে নোটিস করি। কক্ষের দাবি হস্তান্তরের জন্য এ ওয়াই মশিউজ্জামানকে ই-মেইলে পত্র প্রেরণ করি। তিনি চাবি হস্তান্তর করেননি, তারপর তার সাথে আদালতে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলি।”
বর্তমানে সমিতির কার্যক্রম ‘অচলাবস্থা’ বিরাজ করছে উল্লেখ করে অজি উল্লাহ বুধবার নির্বাচনের অসম্পন্ন কাজ ‘সম্পন্ন’ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

এদিকে আইনজীবী সমিতির বর্তমান সম্পাদক ও বিএনপি সমর্থক প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজল বুধবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, অজি উল্লাহ নির্বাচন পরিচালনায় উপ-কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে যে দাবি করছেন, তা ঠিক নয়।
যে সভায় অজি উল্লাহকে নির্বাচনের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য আহ্বায়ক করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করছেন, ওই গত ১২ এপ্রিল সমিতির এমন কোনো সভাও হয়নি বলে দাবি করেন কাজল।
কাজল বলেন, “অজি উল্লাহ নেতৃত্বে তথাকথিত নতুন নির্বাচন সাব-কমিটি গঠন, ভোট কাউন্টিং বা নির্বাচনী ফলাফল বিষয়ে তাদের যে কোনো পদক্ষেপ অবৈধ। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সুমহান ঐতিহ্যকে কলঙ্কিত করার নির্লজ্জ অপচেষ্টা। এ ধরনের অবৈধ, নীতিহীন কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য সবাই আহ্বান জানাচ্ছি।”
এদিকে অজি উল্লাহ মঙ্গলবার বলেছিলেন, “বারের কল্যাণ ও মর্যাদা রক্ষার জন্য এবং অচলাবস্থা নিরসনের জন্য আমরা এই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছি। স্বাচ্ছভাবে সম্পাদক পদে ভোট ফ্রেশ গণনা করে পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ করা হবে।”
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের তিনতলার সম্মেলন কক্ষের সামনে বুধবার ভোটের ফল ঘোষণা নিয়ে মারামারিতে জড়ায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

twenty + 15 =

সবচেয়ে আলোচিত