ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯   ভোর ৫:২০ 

সর্বশেষ সংবাদ

মামলাজট কমাতে ৮ বিভাগে বিচারপতির নেতৃত্বে মনিটরিং সেল হবে, দুর্নীতির বিষয়ে নো কম্প্রোমাইজ : প্রধান বিচারপতি

মামলাজট নিরসন এবং বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং গতিশীলতা আনতে মনিটরিং সেল গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। দেশের আট বিভাগে হাইকোর্ট বিভাগের একজন করে বিচারপতির নেতৃত্বে পৃথক আটটি সেল গঠন করা হবে বলেও জানান তিনি।
রোববার (২ জানুয়ারি) প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যলয় কর্তৃক আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক নম্বর বিচার কক্ষে এ সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়।
প্রধান বিচারপতি বলেন, প্রতিমাসে মনিটরিং সেল থেকে প্রতিবেদন গ্রহণ করবো। পুরাতন মামলা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে নিষ্পত্তির বিষয়ে সুপারভাইস এবং মনিটরিং করা হবে।
সীমিত সম্পদ ও সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে বিচারিক সময় ও দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করে প্রত্যেক বিচারককে মামলা নিষ্পত্তির অভূতপূর্ব অভিযাত্রায় অগ্রসেনানী হওয়ার ইতিবাচক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
বিচার বিভাগের জন্য মামলাজট সুখকর নয় উল্লেখ করে নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি মামলাজট থেকে মুক্ত হওয়ার যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিচারকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আসুন কঠোর পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও কর্তব্যনিষ্ঠার মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীর প্রতি সমবেদনা ও ভালোবাসা দিয়ে অধিক পরিমাণ মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হই। এটি হবে বিচার বিভাগের জন্য মামলাজট থেকে মুক্তির যুদ্ধ।
হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, ন্যায়বিচার জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া জনগণের প্রতি দয়া নয় বরং এটি জনগণের সহজাত অধিকার। এই অধিকারকে কেবল সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে সাব্যস্ত করতে আমি রাজি নই। ন্যাবিচারের সৌকর্য এবং আইনের রাজকীয়তা প্রকৃতপক্ষে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন বটে। সে কারণে নিরপেক্ষতার সাথে, নির্মোহ হয়ে, নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সহজাত অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেশের সকল বিচারকের।
নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন এবং সুপ্রিমকোর্ট বারের সম্পাদক মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্যে বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, “প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে মাত্র ১ হাজার ৯০০ জন বিচারকের কাঁধে যে বিপুল পরিমাণ মামলা অনিষ্পন্ন অবস্হায় রয়েছে, তা বিচার বিভাগের জন্য কোনোভাবেই সুখকর নয়।”
সেই মামলা জট নিরসনের উপর জোর দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, “আমার দায়িত্বভার গ্রহণের সূচনালগ্নে সকল স্তরের বিজ্ঞ বিচারকদের আহ্বান জানাব, আসুন কঠোর পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও কর্তব্যনিষ্ঠার মাধ্যমে বিচার প্রার্থীর প্রতি সমবেদনা ও ভালোবাসা দিয়ে অধিক পরিমাণ মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হই।”
“এটি হবে বিচার বিভাগের জন্য মামলার জট থেকে মুক্তির যুদ্ধ,” ঘোষণা দিয়ে মামলা জট নিরসনে নিজের কর্মপরিকল্পনাও তুলে ধরেন প্রধান বিচারপতি ।
তিনি বলেন, অধস্তন আদালতে মামলা জট নিরসনে আটটি বিভাগের জন্য হাই কোর্ট বিচাগের একজন করে বিচারপতিকে প্রধান করে আটটি মনিটরিং সেল গঠন করা হবে। তিনি প্রতি মাসে প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রতিবেদন নেবেন। পুরনো মামলাগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নিষ্পত্তির বিষয়ে তদারক করবেন।
প্রধান বিচারপতি বলেন, “যে জাতি তার ৩০ লক্ষ সন্তানের রক্তের বিনিময়ে এবং কোটি কোটি মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে এবং অসীম সাহসিকতার সাথে জীবনকে বাজি রেখে পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করতে পারে, সে জাতি বিচার বিভাগের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, এটা আমার কখনই বিশ্বাস হয় না। আমি বরাবর আশাবাদী একজন মানুষ।”
বিচার বিভাগের ‘গঠনমূলক’ সমালোচনাকে গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিচারপতি হাসান ফয়েজ বলেন, “সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার কোনো অশুভ ব্যক্তি বা গোষ্ঠির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা কখনই মেনে নেয়া হবে না।
“আমি উদার চিত্তে বিচার বিভাগকে নিয়ে আইনের কাঠামোর মধ্যে যে কোনো গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। কবিগুরুর ভাষায় বলতে চাই, ‘নিন্দা করতে গেলে বাইরে থেকে করা যায়, কিন্তু বিচার করতে গেলে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়’। আপনারা যারা বিচার বিভাগের আলোচক ও সমালোচক বন্ধু রয়েছেন, তারা বিচার বিভাগের সমস্যা উপলব্ধি করবেন, নিঃসংকোচে আলোচনা বা সমালোচনা করবেন রাষ্ট্র ও জনগণের বৃহত্তর কল্যাণকামিতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে।”
রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ আইন সভা, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের সমন্বিত কাজের উপরও জোর দেন প্রধান বিচারপতি।
“রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের একটি অঙ্গ যদি দুর্বল বা সমস্যাগ্রস্ত হয়, তাহলে রাষ্ট্রটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হতে পারে না। সে কারণে আমি বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রের অপর দুটি বিভাগ তাদের নিজ নিজ অবস্থানে থেকে বিচার বিভাগের সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। রাষ্ট্রের সকল বিভাগ ও ব্যক্তিকে অবশ্যই বারবার স্মরণ করতে হবে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে গণতান্ত্রিক সভ্যতা পরাজিত হবে।”
আপিল বিভাগের ১ নম্বর বিচার কক্ষে সকাল সাড়ে ১০টায় এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হয়। রীতি অনুযায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

11 + 16 =

সবচেয়ে আলোচিত