ঢাকা   শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২২, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯   ভোর ৫:১৪ 

সর্বশেষ সংবাদ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত থমকে আছে, বিচার হয়নি গণহত্যার

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনার বিচার করার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তা থেমে আছে।
২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এমন একটা উদ্যোগ নিয়েছিল।
১৯৭১ সালে ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর পরাজয় বরণ করে পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পন করে। এসব সৈন্যকে যুদ্ধের পর আটক করা হয়েছিলো। পরে ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ত্রিদেশীয় এক চুক্তির আওতায় তাদেরকে বিচার করার শর্তে পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
কিন্তু গত ৫০ বছরেও তাদের কোনো বিচার হয়নি। যদিও মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অপরাধীদের বিচার করা হচ্ছে। ২০১০ সালে গঠিত এই ট্রাইব্যুনালে গত ১১ বছরে মোট ৪২ টি মামলার রায় প্রদান করে। দণ্ডিত হয় শতাধিক যুদ্ধাপরাধী। এরমধ্যে ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে ৬ জনের। যাদের মধ্যে রয়েছে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, সালাউদ্দিন কাদের চৌধূরী, আব্দুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও মীর কাসেম আলী। আমৃত্যু কারাভোগ করছেন দেলোয়ার হোসেন সাঈদী আর ৯০ বছরের কারাদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত গোলাম আযম কারাগারে মারা যান।

যুদ্ধাপরাধের দায়ে নিজামীর ফাঁসি কার্যকর করার পর পাকিস্তানের পক্ষ থেকে তার সমালোচনা করে বিবৃতি দেওয়া হলে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিচারের বিষয়টি নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়। বাংলাদেশ পাকিস্তানের এ প্রতিক্রিয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তখনই তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ সেনা কর্মকর্তা যাদের নেতৃত্বে গণহত্যা চালানো হয়েছিল তাদের বিচার কাজ শুরু করবে।
অান্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক আইনজীবী তুরিন আফরোজ “আইন আদালত”কে জানিয়েছেন, ১৯৭৩ সালের আইন অনুসারে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যদি কেউ মানবতাবিরোধী অপরাধ করে থাকে এবং সে যে দেশেরই নাগরিক হোক না কেনো বাংলাদেশে তার বিচার করা সম্ভব।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনেও বলা আছে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা যেকোনো রাষ্ট্রেই হোক না কেনো, অন্য কোনো রাষ্ট্রও তার বিচার করতে পারে।
তুরিন আফরোজ বলেন, পাকিস্তানি এই সৈন্যদের বিচার করা যাবে কীনা তার আইনগত বিষয়গুলো তারা বিশ্লেষণ করে দেখেছিলেন। এর মধ্যেই ট্রাইব্যুনালে বিভিন্ন মামলায় পাকিস্তানি সৈন্যদের নামও এসেছে।
তিনি জানান, এসব সৈন্যের ব্যাপারে তারা তথ্য সংগ্রহের কাজ করেছিলেন। কিন্তু নানাবিধ কারণে তদন্তটি শেষ হয় নি।
ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৭৩ সালে স্বাক্ষরিত বন্দী বিনিময় চুক্তির আওতায় পাকিস্তানি সৈন্যদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিলো।

ওই চুক্তিতে সৈন্যদের পাকিস্তানের মাটিতে বিচারের কথা উল্লেখ করা না হলেও পাকিস্তান সরকার তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করবে এরকম সমঝোতা হয়েছিলো।
কিন্তু এই চুক্তিটি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার মতো অপরাধকে কেউ ক্ষমা করতে পারে না। এ ধরনের কোনো চুক্তি হলে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে সেটা বাতিল বলে গণ্য হবে।
এ ছাড়া এই চুক্তিটি বাংলাদেশের সংসদে অনুমোদিত হয়নি। ফলে কোনো আদালত বিচারের সময় ওই আইনটিকে গ্রহণ করতে পারে না। এই ১৯৫ সৈন্যের মধ্যে এখনও অনেকে বেঁচে আছে বলে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ধারণা করছে। তাদের কে কোন পদে এবং কোথায় যুদ্ধ করেছে সেসব দলিল তদন্ত সংস্থার হাতে রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষকরা বলছেন, আদতে ১৯৫ পাকিস্তান সেনা কর্মকর্তার কথা বলা হলেও তালিকায় মোট ২শ’ জন ছিলো। তারা কিভাবে, কি কারণে বাদ পড়ে সংখ্যাটি ১৯৫ হলো তা জানা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করেন ড. এম হাসান জানান, আমাদের কাছে যে অভিযুক্তের তালিকা আছে সেটি যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া। তখন আমাদের কাছে অনেক তথ্যপ্রমাণ ছিল না, পরবর্তীতে যেগুলো এসেছে। ফলে এখন নতুন তদন্ত এবং বিদ্যমান তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে তালিকা হতে পারে। তবে এটা করতে গিয়ে সময় বেশি নিলে চলবে না। দ্রুতই বিচারটা হওয়া জরুরি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সবচেয়ে আলোচিত