ঢাকা   শুক্রবার, ৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯   রাত ৩:১৮ 

সর্বশেষ সংবাদ

আগুনে পুড়ে ৫ রোগীর মৃত্যুঃ ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে ইউনাইটেড হাসপাতালকে সমঝোতায় আসতে বলেছে হাইকোর্ট

রাজধানীর গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে আগুন লেগে পাঁচ রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে ‘সমঝোতায়’ আসতে বলেছে হাই কোর্ট। খবর বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

এ সংক্রান্ত তিনটি রিট আবেদন একসঙ্গে শুনে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ সোমবার এ আদেশ দেয়। 

আগামী ১৩ জুলাই বিষয়টি পরবর্তী আদেশের জন্য রেখে তার আগেই ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে সমঝোতা সেরে ফেলতে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সেই সঙ্গে ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে করা মামলাটির তদন্তও দ্রুত শেষ করতে বলেছে আদালত।

আদালতে এদিন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার। রিট আবেদনকারীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী অনীক আর হক, হাসান এম এস আজিম ও মুনতাসির আহমেদ।

ইউনাইটেড হাসপাতালের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী রোকন উদ্দিন মাহমুদ, মোস্তাফিজুর রহমান খান ও তানজীব উল আলম।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত পরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স এবং পুলিশের মহাপরিদর্শকের পক্ষ থেকে আদালতে যে তিনটা প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, তাতে ইউনাইটেড হাসপতালের ‘অবহেলা’ স্পষ্ট।

“তাই ক্ষতিপূরণের বিষয়ে আগামী ১২ জুলাইয়ের মধ্যে দুই পক্ষকে, মানে যারা মারা গেছে তাদের পরিবার এবং ইউনাইটেড হাসপাতালকে সমঝোতায় আসতে বলেছে আদালত। না হলে ১৩ জুলাই আদালত আদেশ দেবে।”

ইউনাইটেড হাসপাতালের আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রাজউক, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও ইউনাইটেড হাসপাতালকে ওই ঘটনার প্রতিবেদন দিতে বলেছিল আদালত। সে অনুযায়ী চারটি প্রতিবেদনই জমা পড়েছে।

“আজকে সেগুলো উপস্থাপন করা হয়। পুলিশ ও রাজউকের প্রতিবেদন নিয়ে আবেদনকারীদের আইনজীবীরা বলেছেন, আইসোলেশন ইউনিটের জন্য বাড়তি যে স্ট্রাকচার করা হয়, সেটার কোনো অনুমোদন ছিল না। বলা হয়, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। ফলে প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে যে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ছিল।

“আমরা আমাদের প্রতিবেদনে বলেছি, এ ঘটনায় ইউনাইটেড হাসপাতালের কোনো রকম গাফিলতি ছিল না। ইউনাইটেড একটি জেনারেল হাসপাতাল, যদিও এখানে বিশেষায়িত সুবিধাও আছে। কিন্তু ছোঁয়াচে রোগ, বিশেষ করে বায়ুবাহিত সংক্রামক ব্যাধির জন্য আইসোলেশন ফেসিলিটিজ বাংলাদেশের কোনো প্রাইভেট হাসপাতালে নাই।

আগুনে পুড়ে যাওয়া গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনাভাইরাস ইউনিট। বুধবার রাতের অগ্নিকাণ্ডে সেখানে চিকিৎসাধীন পাঁচজন রোগীর মৃত্যু হয়। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

“ইউনাইটেড হাসপাতাল সরকারের অনুরোধে জুরুরি ভিত্তিতে এই ব্যবস্থাটা তৈরি করেছিল। এই জরুরি পরিস্থিতি তাৎক্ষণিক মোকাবেলা করার জন্য। মার্চ এপ্রিলের দিকে অফিস খোলা ছিল না, সে কারণে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এখানে নেওয়া যায়নি। কিন্তু ইউনাইটেড হাসপাতাল সবসময়ই এসব কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়। বিশেষ একটা পরিস্থিতির কারণে আমরা সেটা নেওয়ার সুযোগ পাইনি।”

এই আইনজীবী বলেন, হাসপাতালের ফায়ার এক্সটিংগুইশার মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে।

“ওই সময় কন্ট্রাকটরদের সার্ভিসিং করে দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু মহামারীর কারণে তারা সেটা করার ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করে। ক্লোজড সার্কিড ক্যামেরায় দেখা গেছে, দেড়-দুই মিনিটের মধ্যে ওই দুঘর্টনাটা ঘটেছে। সুতরাং এটা দুর্ঘটনা ছাড়া কিছুই না।”

এ আইনজীবী বলেন, যিনি ১৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে রিট আবেদন করেছেন তাকে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি তিনি ওই ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন কিনা।

“তিনি বলেছেন, ইউনাইটেড হাসপাতালকে চিঠি দিয়ে তিনি ক্ষতিপূরণের বিষয়ে আলোচনায় বসার কথা বলেছেন। তবে কোনো অঙ্কের ক্ষতিপূরণ সেখানে চাননি। এই নিরিখে কোর্ট বলেছে যে, আপনারা আলোচনায় বসেন। আলোচনায় এটা নির্ধারণ করা সম্ভব। ১২ জুলাইয়ের মধ্যে চেষ্টা করেন। যদি না পারেন তাহলে ১৩ জুলাই পরবর্তী আদেশের জন্য রাখলাম।”

আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, “আউট অব কোর্ট আমরা একটা সেটেলমেন্টে যেতে পারব বলে মনে করি। যদি কোনো কারণে সম্ভব না হয়, তাহলে আমরা ১৩ তারিখ পরবর্তী আদেশের অপেক্ষায় থাকব।” 

১৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাই কোর্টে রিট আবেদনটি করেছেন ওই ঘটনায় নিহত রিয়াজুল আলমের স্ত্রী ফৌজিয়া আক্তার।

তার আইনজীবী হাসান এমএস আজিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যেহেতু সবার প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে ইউনাইটেড হাসপাতালের দায় আছে, সব কর্তৃপক্ষই সেটা বলেছে…, সুতরাং ইউনাইটেডই যেন ভিকটিমদের পরিবারের লোকজনদের সাথে আলোচনা করে ক্ষতিপূরণ দেয়, সেটা আদালত বলেছে।”

ইউনাইটেড হাসপাতালের কাছে সরাসরি ক্ষতিপূরণের দাবি করেছেন কিনা জানতে চাইলে এ আইনজীবী বলেন, “আমরা আগেই একটা আবেদন করেছিলাম। তখন তারা বলেছিল যে, রিয়াজুল আলমের স্ত্রী, মানে ফৌজিয়া আক্তারকে ইউনাইটেড হাসপাতালে চাকরি দেবে আর বাচ্চাকে ইউনাইটেড স্কুলে পড়াবে।

“এটা খুবই অমানবিক আচরণ। উনার স্বামীকে মেরে উনাকে ওইখানে চাকরি দেবে। এটা কি হতে পারে?”

আগুনে পুড়ে যাওয়া গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনাভাইরাস ইউনিটটি বৃহস্পতিবার পরিদর্শন করেন সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরা। বুধবার রাতের অগ্নিকাণ্ডে সেখানে চিকিৎসাধীন পাঁচজন রোগীর মৃত্যু হয়।

গত ২৭ মে রাত পৌনে ১০টার দিকে গুলশানের বেসরকারি ওই হাসপাতালটির নিচের প্রাঙ্গণে করোনাভাইরাসের রোগীদের জন্য স্থাপিত আইসোলেশন ইউনিটে আগুন লাগলে একটি কক্ষে পাঁচ রোগীর মৃত্যু ঘটে। তাদের মধ্যে তিনজনের কোভিড-১৯ পজিটিভ ছিল।

নিহতরা হলেন মো. মাহবুব (৫০), মো. মনির হোসেন (৭৫), ভারনন অ্যান্থনি পল (৭৪), খোদেজা বেগম (৭০) ও রিয়াজ উল আলম (৪৫)।

ওই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও গাফিলতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠন এবং নিহতদের পরিবারকে পাঁচ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে গত ৩০ মে একটি রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নিয়াজ মুহাম্মদ মাহবুব ও শাহিদা সুলতানা শিলা।

আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া মো. মাহবুব এলাহী চৌধুরীর ছেলে আননান চৌধুরী এবং ভারনন অ্যান্থনি পলের ছেলে আন্দ্রে ডোমিনিক পলও পরে সেই রিটের বাদী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

এরপর গত ২১ জুন রিয়াজুল আলমের স্ত্রী ফৌজিয়া আক্তার ১৫ কোটি ক্ষতিপূরণ চেয়ে আলাদা একটি রিট আবেদন করেন। তাতে এক কোটি টাকা অন্তবর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়।

এছাড়া এ ঘটনার বিচারিক তদন্ত চেয়ে ১ জুন আরেকটি রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী রেদওয়ান আহমেদ ও হামিদুল মিসবাহ। কেন বিচারিক তদন্ত করা হবে না- সে বিষয়ে রুলও চাওয়া এ রিটে।

গত ২ জুন প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রাজউক, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ১৪ জুনের মধ্যে ঘটনার প্রতিবেদন দিতে বলে হাই কোর্ট। সে অনুযায়ী প্রতিবেদন দাখিল করা হলে সোমবার তা উপস্থাপন করা হয়।
পুলিশের দেওয়া প্রতিবেদনে ইউনাইটেড হাসপাতালের গাফিলতির কথা রয়েছে। রাজউক বলছে, করোনাভাইরাসের জন্য আলাদা করে আইসেলেশন ইউনিট করার অনুমতি নেয়নি ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ।
ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদনে বলা হয়, অগ্নিকাণ্ডের সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিলে রোগীদের মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হত। তাছাড়া হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

two + 11 =

সবচেয়ে আলোচিত