ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯   সকাল ৬:১৭ 

সর্বশেষ সংবাদ

ভুয়া পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ঠেকাতে হাইকোর্টের যুগান্তকারী নির্দেশনা, বন্ধ হবে পুলিশের হয়রানি

ভুয়া পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ঠেকাতে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করে সঠিক ও সুস্পষ্টভাবে পরোয়ানা জারি ও কার্যকর করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি সাত দফা নির্দেশনা দিয়েছে হাই কোর্ট।
এক রিট আবেদনে রুলের শুনানির সময় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ বুধবার এসব নির্দেশনা দেন।
রিট আবেদনকারীর আইনজীবী এমাদুল হক বসির জানান, এখতিয়ার পরিবর্তন হওয়ায় নির্দেশনা দিয়ে রুলটি রিট এখতিয়ারাধীন বেঞ্চে উপস্থাপন করে শুনানি করতে বলেছেন আদালত। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

হাই কোর্টের ৭ দফা নির্দেশনা –

১. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রস্তুতকারী ব্যক্তিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৭৫ এর বিধান অনুয়ায়ী নির্ধারিত ফরম সঠিক ও সুস্পষ্টভাবে পূরণ করতে হবে-

১.১ যে ব্যক্তি বা যে সকল ব্যক্তি পরোয়ানা কার্যকর করবেন, তার বা তাদের নাম, পদবী ও ঠিকানা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

১.২ যার প্রতি পরোয়ানা জারি করা হচ্ছে তার নাম ও ঠিকানা মামলার নম্বর ও সুনির্দিষ্ট ধারাসহ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

১.৩ সংশ্লিষ্ট জজ বা ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষরের নিচে নাম ও পদবীর সিলসহ সংশ্লিষ্ট আদালতের সুস্পষ্ট সিল ব্যবহার করতে হবে।

১.৪ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রস্তুতকারী ব্যক্তির (অফিস স্টাফ) নাম, পদবী ও মোবাইল নম্বরসহ সিল ও তার সংক্ষিপ্ত স্বাক্ষর ব্যবহার করতে হবে; যাতে পরোয়ানা কার্যকরকারী ব্যক্তি পরোয়ানার সঠিকতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহের উদ্বেগ হলে পরোয়ানা প্রস্তুতকারীর সঙ্ড়ে সরাসরি যোগাযোগ করে নিশ্চিত হতে পারেন।

২. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রস্তুত হলে স্থানীয় অধিক্ষেত্র কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট পিয়ন বহিতে তা এন্ট্রি করে বার্তাবাহকের মাধ্যমে পুলিশ সুপারের কার্যালয় কিংবা সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠাতে হবে।

পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের বা থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা পিয়ন বহিতে স্বাক্ষর করে তা বুঝে নিতে হবে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রেরণ ও কার্যকর করার জন্য পর্যায়ক্রমে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কাজে লাগানো যেতে পারে।

৩. স্থানীয় অধিক্ষেত্রের বাইরের জেলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার ক্ষেত্রে পরোয়ানা জারি করা কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সিলগালা করে এবং অফিসের সিলমোহরের ছাপ দিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পাঠাতে হবে।

৪. সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকতা সিলমোহরের ছাপ দেওয়া খাম খুলে প্রাপ্ত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।

তবে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ক্ষেত্রে সন্দেহ হলে পরোয়ানা প্রস্তুতকারীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন।

৫. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা গ্রহণকারী কর্মকর্তা পরোয়ানা কার্যকর করার আগে পুনরায় পরীক্ষা করে যদি সন্দেহ পোষণ করেন, তবে পরোয়ানা প্রস্তুতকারীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়ে পরোয়ানা কার্যকর করবেন।

৬. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অনুযায়ী আসামি বা আসামিদের গ্রেপ্তারের পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিকটস্থ আদালতে পরোয়ানাসহ হাজির করতে হবে।

এবং ম্যাজিস্ট্রেট বা জজ গ্রেপ্তার করা আসামি বা আসামিদের জামিন না দিলে আদেশের অনুলিপিসহ জেল হাজতে পাঠাতে হবে। প্রয়োজনে সম্পূরক নথি তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা আদালতে পাঠাতে হবে।

৭. সংশ্লিষ্ট আসামি বা আসামিদের কোন থানার কোন মামলায়, কোন আদালতের আদেশে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে তা সংশ্লিষ্ট জেল সুপার কিংবা অন্য কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারিকারী আদালতকে জানাবেন। পরবর্তীতে আর কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পেলে তা নিশ্চিত হয়ে কার্যকর করবেন জেল সুপার।
আদেশ বাস্তবায়নের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, সুরক্ষা ও সেবা বিভাগের সচিব, আইন সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, মহা-কারা পরিদর্শক ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে বলা হয়েছে।
সেই সাথে আদেশটি প্রত্যেক দায়রা জজ ও মহানগর দায়রা জজসহ দেশের সব ট্রাইব্যুনাল, বিশেষ জজ আদালতের বিচারক, মুখ্য বিচারিক হাকিম ও মুখ্য মহানগর হাকিমকে জানাতে বলা হয়েছে।
কোনো থানায় কোনো মামলা না থাকলেও গত বছর ৩০ অক্টোবর ভুয়া পরোয়ানায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন আশুলিয়ার মির্জা নগর এলাকার টাকসুর গ্রামের নূর মোহাম্মদের ছেলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কৃষি বিভাগের প্রোগ্রাম অফিসার মো. আওলাদ হোসেন।
প্রথমে কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের নামে ভুয়া পরোয়ানায় আওলাদকে আশুলিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর একের এক একই মামলার ভুয়া পরোয়ানায় রাজশাহী, বাগেরহাটের আদালত, কারাগার হয়ে এখন শেরপুর কারাগারে তিনি। কিন্তু কোনো আদালতেই মামলার কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
এর ফলে তাকে যে বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়নি, তা নিশ্চিত হতেই আওলাদের স্ত্রী শাহনাজ পারভীন গত বছর ৯ ডিসেম্বর রিট আবেদন করেন।
পরদিন সে রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আদালত রুলসহ আদেশ দেয়। ১৫ জানুয়ারি হাই কোর্টে আওলাদকে হাজির হতে বা হাজির করতে নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট।
একই সঙ্গে তাকে ভুয়া পরোয়ানায় জড়ানোর ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেওয়া হয়।
এছাড়া তার বিরুদ্ধে আর কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না থাকলে, যাচাইসাপেক্ষে তার মুক্তির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
আওলাদের বিরুদ্ধে আর কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না থাকায় চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি তাকে মুক্তি দেয় কারা কর্তৃপক্ষ।
৬ জানুয়ারি মুক্তি পেয়ে আওলাদ নির্দেশমতো ১৫ জানুয়ারি আদালতে হাজির হন। আদালত ৯ মার্চ পরবর্তী আদেশের জন্য রাখে।  
এর মধ্যে সিআইডি ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সাথে জড়িত চার জনকে গ্রেপ্তার করে। চার জনের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়।
আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিসহ গত ৯ মার্চ ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়ে সিআইডি তদন্ত প্রতিবেদন দেয় আদালতে।
এরপর বুবধার রুল শুনানির জন্য উঠলে রুল শুনানি না করে ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে সাত দফা নির্দেশনা দেয় উচ্চ আদালত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

11 + seven =

সবচেয়ে আলোচিত