ঢাকা   সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯   রাত ১০:১৫ 

সর্বশেষ সংবাদ

আইনজীবী অন্তর্ভুক্তির পরীক্ষায় প্রশ্ন কঠিন হয়েছে দাবি করে ‘হট্টগোল-ভাঙচুর’

হট্টগোল, ভাঙচুর এবং বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ‘আইনজীবী অন্তর্ভুক্তি’ পরীক্ষা।
করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে এক দফা পিছিয়ে শনিবার ৯টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত এ পরীক্ষা হয়।
তবে কোনো কেন্দ্রে পরীক্ষা হয়নি আবার কোনো কেন্দ্রে সময় বাড়িয়ে বেলা ২টা পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।  
আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শেখ বোরহানউদ্দিন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজ, সূত্রাপুরে সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ, সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, টিকাটুলীর সেন্ট্রাল ওমেন্স কলেজ, বিসিএসআইআর হাই স্কুল ও লক্ষ্মীবাজারের ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষায় অংশ নেন প্রায় ১৩ হাজার জন।
সকালে শুরুর পরপরই ‘প্রশ্নপত্র কঠিন হয়েছে’ এমন অভিযোগ তুলে মোহাম্মদপুর ও পুরান ঢাকার কয়েকটি কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা বর্জন করে।
কোনো কোনো কেন্দ্রে হট্টগোল, ভাঙচুরের কারণে পরীক্ষাই হয়নি বলে জানিয়েছেন কয়েকজন।
তবে কেন্দ্রে হট্টগোল, পরীক্ষা বর্জন বা পরীক্ষা না দিতে বাধ্য করানোর ব্যপারে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি বার কাউন্সিলের সচিব রফিকুল ইসলাম।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “শুনেছি মোহাম্মদপুরের একটি কেন্দ্রে হট্টগোল হয়েছে। এর বেশি কিছু আপাতত বলতে পারব না।”
পদাধিকার বলে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, “যারা পরীক্ষা দিতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি তাদের ব্যাপারে পরে বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারলে আমরা ব্যবস্থা নেব। যারা পরীক্ষা দিতে পারেনি তারা কি বাধ্য হয়ে দিতে পারেনি, নাকি ইচ্ছা করে দেয়নি, তা বুঝেশুনে ব্যবস্থা নিতে হবে।
“এর বেশি এখন তো কিছু করতে পারব না। তাছাড়া আমি একা তো কিছু করতে পারব না, সবার সাথে বসতে হবে। চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলতে হবে। উনি তো এখন নিজেও পারবেন না। আমাদের পাঁচজনের কমিটি। এই পাঁচজন মিলে বসে সিদ্ধান্ত নেব।”
লক্ষ্মীবাজারের ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়েছেন এমন একজন নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, “সব এলোমলো হয়ে গছে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর ৫ মিনিটের মাথায় পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রের গেট ভেঙে প্রশ্ন, খাতা নিয়ে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে যায়। পুলিশ তখন একেবারেই নীরব ছিল। আধাঘণ্টার উপরে এভাবে ছিল।
“পরে টিমসহ ম্যাজিস্ট্রেট আসলে কিছু পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে ঢোকে। আমি কেন্দ্রের ভেতরেই ভাঙা টেবিলে বসে ছিলাম। কিন্তু ভেতরে তখন শিক্ষকরা ছাড়া কেউ ছিল না। পরবর্তীতে আমিসহ কিছু পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিই। এক ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে বেলা ২টা পর্যন্ত  পরীক্ষা হয়।”
এই পরীক্ষার্থীর অভিযেগি, পরীক্ষা দিতেই এসেছিল সবাই। কিন্তু অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন এবং বার কাউন্সিলের ইতিহাসে নজিরবিহীন প্রশ্নবিদ্ধ প্রশ্ন হয়েছে। মানদণ্ড বজায় রেখে এ প্রশ্নপত্র করা হয়নি।
একই অভিযোগ করেন সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী জাকের হোসেন।
তিনি বলেন, “স্বাস্থ্যবিধি মেনেই নির্ধারিত সময়ের আগে কেন্দ্রে ঢুকি। প্রশ্নপত্র পাওয়ার পর পরই পরীক্ষার্থীরা হইচই শুরু করে। প্রশ্নটা একেবারেই ব্যতিক্রম হয়েছে। গতানুগতিক যে প্রশ্ন করে আসছে বার কাউন্সিল, সেরকম প্রশ্ন এবার হয়নি।
“এক পর্যায়ে কিছু শিক্ষার্থী এসে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে পরীক্ষার্থীদের খাতা কেড়ে নিতে শুরু করে। দরজা-জানালা ভাঙচুর শুরু করে তারা। তারা প্রশ্নপত্র, খাতা মাঠে ফেলে দেয়। কেউ কেউ স্বেচ্ছায়ও ফেলে দিয়েছে। সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলে এ পরিস্থিতি। সেসময় ম্যাজিস্ট্রেট, পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য একটা রুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন।”
জাকের বলেন, “বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্র নিয়ন্ত্রক ঘোষণা দেন পরীক্ষা হবে না। বাসায় চলে যেতে বলেন পরীক্ষার্থীদের। ঘোষণা দেওয়ার পরও যখন কিছু পরীক্ষার্থী বের হচ্ছিল না, তাদের পুলিশ এসে পিটিয়ে বের করে দেয়। সাড়ে ১১টার মধ্যে গোটা কেন্দ্র খালি করে ফেলা হয়। এরপর আর পরীক্ষাই হয়নি।” 
বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় নৈরাজ্য নিয়ে নিজের ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল।
চারটি ছবি দিয়ে তিনি লিখেছেন, “বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এডভোকেট তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষায় নজিরবিহীন নৈরাজ্যের কারণে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এই অরাজকতায় আমি ব্যথিত ও ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।
“এ প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে আমি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান জনাব এ এম আমিন উদ্দিন, বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি জনাব মো. নুরুজ্জামান, ভাইস-চেয়ারম্যান জনাব ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, বার কাউন্সিল সদস্য জনাব এ জে মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে কথা বলেছি। কোন প্রকৃত পরীক্ষার্থী যেন কোনভাবেই ক্ষতিগ্রস্থ না হয় সে বিষয়ে তারা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিবেন সেই অনুরোধ রেখেছি। শিক্ষার্থীরা হতাশ হবেন না। আমার একান্ত বিশ্বাস, বার কাউন্সিল কতৃপক্ষ আপনাদের পক্ষেই থাকবেন।”
গত ২৬ সেপ্টেম্বর এ পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। তার আগেই গত ২০ সেপ্টেম্বর নোটিস দিয়ে বার কাউন্সিল জানায়, করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সে নোটিসেই ১৯ ডিসেম্বর পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণা করে বার কাউন্সিল। 
এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষা না নিয়ে সরাসরি মৌখিক পরীক্ষার নিয়ে আইনজীবী অন্তর্ভুক্তির দাবিতে আন্দোলনে নামেন পরীক্ষার্থীরা। তারা বিভিন্ন দপ্তরে এ দাবি তুলে ধরেন। কিন্তু ঘোষিত তারিখে পরীক্ষা নিতে অনড় থাকে বার কাউন্সিল।  বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে অর্থাৎ আইনজীবী সনদ পেতে নৈর্ব্যক্তিক, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
ওই তিন ধাপের যেকোনো একটি পরীক্ষায় কেউ একবার উত্তীর্ণ হলে পরবর্তী পরীক্ষায় তারা দ্বিতীয়বার মত অংশগ্রহণের সুযোগ পান। দ্বিতীয়বারও অনুত্তীর্ণ হলে তাদের পুনরায় শুরু থেকেই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়।
২০১৭ সালের ৩৪ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে লিখিত পরীক্ষায় দ্বিতীয়বারের মত মত বাদ পড়া তিন হাজার ৫৯০ জন এবং ২০২০ সালে নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৮ হাজার ৭৬৪ জনসহ মোট ১২ হাজার ৩৫৪ জন সনদপ্রত্যাশী পরীক্ষার্থী এই লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সবচেয়ে আলোচিত